স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে সমন্বয় নেই মন্ত্রনালয় ও ইসির কাজে
তারিখ ঘোষণার নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন
শাহীন রহমান

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে এলেও মন্ত্রণালয় বলছে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য তারিখ সম্পর্কেও তারা আগে থেকে অবগত ছিল না।
ইসির পক্ষ থেকে ১২ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হতে পারে—এমন একটি সম্ভাব্য তারিখের কথা জানানো হয়েছিল। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের অভিযোগের পেক্ষিতে এখন বলা হচ্ছে কমিশনের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, ১২ নভেম্বরকে এই মুহূর্তে নিশ্চিত ভোটের তারিখ বলা ঠিক হবে না। ফলে ইসির ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নাকি কেবল প্রাথমিক পরিকল্পনা—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কয়েক ধাপে আয়োজনের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনায় প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর ২০২৬, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ ১৭ জানুয়ারি ২০২৭, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে আয়োজনের সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব তারিখকে এখনো চূড়ান্ত নির্বাচনী তফসিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কমিশনের পরবর্তী বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। ইসি সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সময়সূচি ছিল একেবারেই প্রাথমিক। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন বা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হয়নি। গণমাধ্যমে সম্ভাব্য নির্বাচনের তারিখ প্রকাশের পরই বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিল না বলেও জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন আয়োজন ও তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ার রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, অর্থ বরাদ্দ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাঠ প্রশাসনের সমন্বয়সহ সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম জড়িত। এ কারণে নির্বাচন আয়োজনের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
দুই পক্ষের বক্তব্যে মূলত একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে নির্বাচন কমিশন কাজ এগিয়ে নিলেও এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমন্বয় এখনো হয়নি। ফলে ১২ নভেম্বরকে সামনে রেখে নির্বাচন প্রস্তুতির বিষয়টিও এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরের মধ্যে দেশের পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন না হওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের প্রেক্ষাপটে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য সময়সূচি অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হবে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে এবং কয়েক ধাপে তা আগামী বছরের মে পর্যন্ত চলতে পারে। এতে দেশের হাজার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের আগে ভোটার তালিকা, সীমানা, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় অর্থসহ বেশ কিছু বিষয় নিষ্পত্তির প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যদি নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে আগে থেকে অবগত না থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হবে—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, ১২ নভেম্বরসহ প্রকাশিত তারিখগুলো চূড়ান্ত নয় এবং কমিশনের পরবর্তী বৈঠকের পরই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এ কারণে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের বৈঠককে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য সময়সূচি, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় এবং নির্বাচন আয়োজনের অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে কমিশনের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।
ফলে আপাতত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে একটি দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ইসি বলছে, সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে কাজ চলছে, তবে ১২ নভেম্বর নিশ্চিত তারিখ নয়। আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং তারা এ সম্পর্কে অবগতও নয়। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘোষণার প্রক্রিয়ায় কমিশন ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরই বিষয়টির চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া যাবে।
আ.দৈ/এসআর




















