পাবলিক পরিবহন
ভয়াবহ অপরাধে জড়াচ্ছে ড্রাইভার-হেলপার ও সুপারভাইজাররা
শাহীন রহমান

ভাড়া নেয়ার সময় লুঙ্গির কোছায় অনেকগুলো টাকা দেখেন সুপারভাইজার, তারপর ইসমাইল হোসেনকে হত্যা রাজ পরিবহনের ড্রাইভার. হেলপার ও সুপারভাইজার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের মুখ ও হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন এবং আরেকটি গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
এ ঘটনায় বাসচালক সোহেল রানা (৪০), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৮) এবং হেলপার মোহাম্মদ মনির হোসেন (১৮) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৪ সেপ্টেম্বর মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রি করে টাকা নিয়ে গাজীপুরে ফিরছিলেন ইসমাইল। কিন্তু অপরাধীরা তাকে হত্যা করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে রেখে যায়।
শুধু ইসমাইলকে হত্যা করা নয়। পাবলিক পরিবহনের ড্রাইভার হেলপার এবং সুপারভাইজারা একেরপর এক অপরাধে সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ তদন্তে তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও এ ধরনের অপরাধ থেকে প্রতিকার মিলছে না। অপরাধের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। হারাতে হচ্ছে মূল্যবান জীবন ও সম্পদ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের একটি অংশই কখনো কখনো যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। গণপরিবহনের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারদের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, যৌন সহিংসতা, মাদক পরিবহনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় একই বাসের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার মিলে যাত্রীকে হত্যার পর টাকা লুটের অভিযোগও উঠেছে।
বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণপরিবহনকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ নতুন নয়। কখনো পরিবহনকর্মীদের একটি অংশ নিজেরাই অপরাধে যুক্ত হয়েছে, আবার কখনো পরিবহন খাতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা যাত্রীবাহী বাসকে অপরাধ সংঘটনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ইসমাইল হোসেনের হত্যার ঘটনায় রোববার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, জামালপুর থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে এক যাত্রীর কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা থাকার বিষয়টি জানতে পেরে বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরে ওই যাত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর তার কাছ থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা নিয়ে মরদেহ ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পাশে ফেলে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পুলিশ বাসের চালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন যাত্রী যে পরিবহনকে নিরাপদ যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, সেই পরিবহনের কর্মীদের বিরুদ্ধেই যদি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠে, তাহলে গণপরিবহনের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।
এর আগেও গণপরিবহনে ডাকাতির ঘটনায়ও চালক-হেলপার-কন্ডাক্টরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত বছর মার্চে সাভারে ঢাকামুখী একটি বাসে অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী লুটের অভিযোগ ওঠে। যাত্রীরা বাসের চালক, হেলপার ও কন্ডাক্টরের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগে বাসের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজারকে আটক করে পুলিশে দেয়া হয়। ওই ঘটনায় যাত্রীদের টাকা ও মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি নারী যাত্রীদের হয়রানির অভিযোগও সামনে আসে।
শুধু ছিনতাই বা ডাকাতি নয় গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাসচালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। গত জুলাই মাসে আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে বাসের চালক, হেলপার ও তাদের এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসে যাত্রী কমে যাওয়ার পর ওই নারীকে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করা হয়।
এর আগে জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে চালক ও হেলপারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য যাত্রীদের নামিয়ে দেয়ার পর ওই নারীকে বাসে আটকে রেখে তার কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালংকার নেয়ার পাশাপাশি যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
২০২২ সালেও ঢাকার আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে এক কলেজছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। ২০২১ সালে সুনামগঞ্জে চলন্ত বাসে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে বাস থেকে লাফ দিয়ে এক কলেজছাত্রী আহত হন। পরে ওই ঘটনায় বাসচালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ঘটনা গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
শুধু যাত্রীদের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রেও বাসকর্মীদের জড়িত থাকার ঘটনা রয়েছে। চট্টগ্রামে র্যাবের অভিযানে একটি বাস থেকে ২১ হাজার ২০০ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় বাসের চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য ছিল, কক্সবাজার থেকে মাদকের চালানটি পরিবহনের মাধ্যমে নিয়ে আসা হচ্ছিল।
২০১৭ সালে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাস ডাকাতির একটি চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছিল, ওই চক্রে বাসের চালক ও হেলপারও যুক্ত ছিলেন। চক্রটির সদস্যরা কখনো যাত্রী সেজে বাসে উঠত, পরে সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মালামাল লুট করত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
২০২০ সালেও ডিবির অভিযানে একটি ডাকাত চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়। তাদেও ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটির কয়েকজন সদস্য আগে পরিবহন খাতে চালক বা কর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন। বাসের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা, রুট ও যাত্রী ওঠানামার পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা অপরাধ সংঘটনে কাজে লাগানো হতো বলে অভিযোগ ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পরিবহন শ্রমিকদের অপরাধে সম্পৃক্ততার সঙ্গে মাদক ব্যবহারের বিষয়টিও আলাদাভাবে আলোচনায় এসেছে। পেশাদার চালকদের ওপর করা একাধিক গবেষণায় মাদক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশেসজ্ঞরা বলছেন জড়িপে দেখা গেছে যেসব ড্রাইভার, হেলপার ও সুপারভাইজার মাদকাসক্ত তারা এই ধরনের কর্মকান্ডে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফার্যাল সেন্টারের এক গবেষণায় ৩ দশমিক ৮১ শতাংশের ডোপ টেস্ট পজিটিভ পাওয়া যায়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত নমুনার ওপর গবেষণাটি করা হয়েছিল। অন্যদিকে ঢাকার আশপাশের ৫০৩ জন বাসচালককে নিয়ে করা আরেক গবেষণায় ৭৫ শতাংশ চালক মাদক ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন।
বাস পরিবহন খাত নিয়ে টিআইবির এর গবেষণাতেও মাদক ও অ্যালকোহল ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেয়া ২২ দশমিক ২ শতাংশ বাসশ্রমিক জানিয়েছেন, চালকরা মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করে গাড়ি চালান এবং কন্ডাক্টর, হেলপার ও সুপারভাইজাররা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। শহরভিত্তিক বাস সার্ভিসে এ ধরনের অভিজ্ঞতার হার ছিল আরও বেশি।
পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নিয়োগে যথাযথ যাচাইয়ের ঘাটতি, প্রশিক্ষণের অভাব, মাদক পরীক্ষা না করা, শ্রমিকদের অনিয়ন্ত্রিত নিয়োগ এবং মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের দুর্বলতা—এসব কারণে গণপরিবহনে অনিয়ম ও অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে চালক ও সহকারীদের হাতে যাত্রীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে। যাত্রী কখন উঠছেন, কোথায় নামছেন, বাসের দরজা কখন খোলা বা বন্ধ হচ্ছে, কোন রুটে কখন যাত্রী কম থাকে—এসব বিষয়ে তাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে। অপরাধী চক্রের সঙ্গে কোনো পরিবহনকর্মী যুক্ত হলে এই তথ্য অপরাধ সংঘটনে সুবিধা দিতে পারে।
যাত্রী নিরাপত্তায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালক-হেলপার-সুপারভাইজার নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন, নিয়মিত ডোপ টেস্ট, পরিচয়পত্র ও কর্মী ডাটাবেস তৈরি, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে বাসে সিসিটিভি, জিপিএস, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং যাত্রী অভিযোগের কার্যকর প্ল্যাটফর্ম চালু করা প্রয়োজন। কারণ অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি অপরাধের সুযোগ কমিয়ে আনার ব্যবস্থাও জরুরি। তারা বলছেন গণপরিবহন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের জায়গা নয়; এটি প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়, পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনেরও।
আ.দৈ/আরএস




















