রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরণ
সেপ্টেম্বরেই সর্বোচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত, অক্টোবর পর্যন্ত চলতে পারে সংক্রমণের চাপ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:০৬ পিএম  আপডেট: ০৭.০৯.২০২৬ ৯:১৯ পিএম  (ভিজিট : ৩৬)
X

আগামী অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর ভয়াবহ সংক্রমণ  হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এএমএ মুহিত। আগের বছরগুলোর ধরন অনুযায়ি ডেঙ্গু সংক্রমণ আগস্টেই সর্বোচ্চ উঠার কথা। প্রশ্ন উঠেছে আগস্টের পরেও কেন ডেঙ্গু সংক্রমণের সতর্কতা দেয়া হলো। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ি অক্টোবর বর্ষা বিদায় নেয়। এ সময় কেন সংক্রমণ বাড়বে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টিপাতের ধরন যেমন বদলাচ্ছে। বর্ষাকাল দীর্ঘ হচ্ছে। বর্ষার বৃষ্টিপাত অক্টোবর নবেম্বর পর্যন্ত হচ্ছে। এ কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম পিছিয়ে যাচ্ছে। 

এ কারণে সম্প্রতি সময় দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন এবং মারা গেছেন ১১৭ জন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ৬ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন চারজন। চলতি বছরের এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হাসপাতালগুলোতেও শয্যার ওপর চাপ বাড়ছে। 

এই বাস্তবতার মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকৃত পিক টাইম বা সর্বোচ্চ সংক্রমনের সময় এখনো আসেনি। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট অধ্যাপক কবিরুল বাশারের সার্ভিলেন্স ওয়ান ফোরকাস্টিং মডেল বলছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শুধু সেপ্টেম্বরেই ৩০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। তাঁর মতে, অনুকূল আবহাওয়া অক্টোবর পর্যন্ত এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু সংক্রমণ ভয়াবহ হতে পারে। 

এর পেছনে প্রথম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বর্ষা-পরবর্তী সময়ের মশার প্রজনন। অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, বাংলাদেশে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর এখন ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বাড়ে; এর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সেই মশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে মানুষের মধ্যে সংক্রমণও বাড়তে থাকে। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে রোগীর চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক মৌসুমি প্রবণতার অংশ। 

দ্বিতীয় কারণ বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার সমন্বয়। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার জীবনচক্র আবহাওয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে জলবায়ু ও ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তন এডিস মশার ঘনত্ব ও ভাইরাস সংক্রমণের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে আরও বলা হচ্ছে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘায়িত বর্ষা এবং উষ্ণ আবহাওয়া ডেঙ্গুর মৌসুমকে দীর্ঘ করছে। তৃতীয় কারণ মশার প্রজননস্থল দ্রুত তৈরি হওয়া। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন, প্লাস্টিকের পাত্র ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পানিও এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। ফলে শুধু ভারী বৃষ্টি নয়, বৃষ্টির পর জমে থাকা ছোট ছোট পানির উৎসও সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। জলাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। 

এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাজধানীকেন্দ্রিক না থাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী শনাক্ত হচ্ছে। খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে। এর ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কাজ এখন শুধু ঢাকা শহরের মশা নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ রাখলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এডিস মশার বিস্তার যত বেশি এলাকায় হচ্ছে, সংক্রমণের জন্য তত বেশি রিজার্ভার তৈরি হচ্ছে। আক্রান্ত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলে সংক্রমণের বিস্তারও নতুন এলাকায় পৌঁছাতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে মশার ঘনত্ব বেশি থাকা এবং মানুষের চলাচল—দুটিই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ডেঙ্গুর মৌসুমি চরিত্র বদলে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রধান সময় বর্ষাকেন্দ্রিক হলেও এখন রোগটি বছরের আরও দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় উষ্ণতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার বিস্তারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন দিয়ে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যাবে না; নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মানুষের আচরণ, মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা এবং ভাইরাসের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অক্টোবরে কী হবে, তার সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত আসছে সেপ্টেম্বরের বর্তমান সংক্রমণ থেকে। ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চারজনের মৃত্যু দেখাচ্ছে, সংক্রমণের গতি দ্রুত বাড়ছে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বরেই ১ হাজার ৩২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল—তখনও সেটি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি ছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ড আবার ভেঙেছে। অধ্যাপক কবিরুল বাশারের পূর্বাভাসও বলছে, পিক টাইম এখনো পেরিয়ে যায়নি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বরই বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাসে পরিণত হতে পারে; একই সঙ্গে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণের চাপ বজায় থাকতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে শুধু রোগীর সংখ্যাই বাড়ে না, বাড়ে গুরুতর রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন। ডেঙ্গুতে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে বলে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে এলে সাধারণ ওয়ার্ডের পাশাপাশি নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তরল ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসার ওপরও চাপ পড়ে। বর্তমানে ডেঙ্গুর সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরেকটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট—হাম—সামলাচ্ছে। ফলে হাসপাতালের জনবল, শয্যা ও অন্যান্য সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, শুধু কীটনাশক দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মশার ঘনত্ব শনাক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ভিত্তিক বাহক নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসম্পৃক্ততা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা।  অর্থাৎ অক্টোবরের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে—কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় রোগী বাড়ছে এবং কোথায় প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে—এই তিন ধরনের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। সব তথ্য মিলিয়ে অক্টোবরকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য উচ্চঝুঁকির সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণেই সেপ্টেম্বরের শেষভাগ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণের চাপ তীব্র থাকতে পারে।

তারা বলছেন কারণ একদিকে বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিস্থিতি মশার প্রজননকে সহায়তা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারা দেশে মশার বিস্তার, দ্রুত বাড়তে থাকা আক্রান্তের সংখ্যা এবং হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ। তাই অক্টোবরের ভয়াবহতা আসলে শুধু অক্টোবরের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে না। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কতটা মশা জন্মেছে, কত দ্রুত প্রজননস্থল ধ্বংস করা যাচ্ছে, সংক্রমিত মানুষ কতটা দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে—এসবের সমন্বিত ফলই নির্ধারণ করবে অক্টোবর কতটা ভয়াবহ হবে। এখনকার তথ্যের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা তাই একটাই—ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে আগেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যাচ্ছে, সেটিই অক্টোবরের চিত্র নির্ধারণ করতে পারে।

আ.দৈ/এসআর










Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝