রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইলিশের উৎপাদনে ধস প্রজনন রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কাজে আসছে না
নদী-সাগরের পরিবেশ বদল, কমছে মাছের আকারও
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৮ পিএম   (ভিজিট : ৫৭)
X

অক্টোবর মাসকে সাধারণত ইলিশের প্রজনন মৌসুম ধরা হয়। এ কারণে প্রতি বছর এই সময়ে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। মুলত ডিম ছাড়ার সুযোগ দেয়া ও জাটকা নিধন বন্ধ করতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েও কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মিলছে না। ক্রমান্বয়ে কমে আসছে উৎপাদন।

চলতি বছরে এখনে নিষেধাজ্ঞার তারিখ চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে আগামী মাসের শুরুতেই ইলিশ আহরণ বন্ধ ঘোষণা করা হতে পারে। তবে গত কয়েক বছরের মতো চলতি বছরেও বাজারে ইলিশের আকাল চলছে। ফলে এর দাম আকাশ ছোঁয়া। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই নেই ইলিশ। ভরা মৌসুমে ইলিশের উৎপাদনে ধস   নামছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। যার মধ্যে কিছু মনুষ্য সৃষ্টি। বাকীটা প্রাকৃতিক কারণে ঘটছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সব জায়গায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না। ফলে প্রচুর মা ও জাটকা ইলিশ ধরা পড়ছে। অপর দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীতে প্রবাহ কমছে। মোহনায় চর জাগছে। ইলিশ চলে যাচ্ছে গভীর সাগরে। প্রবাহ কম থাকায় ইলিশ নদীতে আসছে না। তবে তারা বলছেন লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন, মাছের আকার এবং জেলেদের আয়, তিনটিই বাড়ানো সম্ভব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. ইয়ামিন হোসেন মনে করেন, জাটকা রক্ষা এবং প্রজননক্ষম মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ইলিশের প্রাচুর্য আবার বাড়তে শুরু করতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। একসময় দেশের নদী, মোহনা ও বঙ্গোপসাগরে প্রচুর ইলিশ পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শুধু ইলিশের মোট উৎপাদনই কমছে না, ধরা পড়া মাছের গড় আকার ও ওজনও কমে আসছে। ফলে একদিকে জেলেদের আয় কমছে, অন্যদিকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কমে দাম বাড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর তথ্য বলছে, প্রায় দুই দশক ধরে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার পর গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। পরের অর্থবছরে তা কমে হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ টনে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। সর্বশেষ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে নতুন করে সমীক্ষা শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণ ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন কমেছে। 

ইলিশ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাছের আকার কমে যাওয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চি। একই সময়ে সাত বছর আগে যেখানে ইলিশের গড় ওজন প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ গ্রামের মধ্যে ছিল, বর্তমানে তা অনেক ক্ষেত্রে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে।  গবেষকদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কারণ ইলিশ দ্রুত বর্ধনশীল মাছ। জাটকা পর্যায়ে মাছ ধরা পড়লে সেটি প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই হারিয়ে যায়। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজনন ও উৎপাদন—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। নদী ও সাগরের পরিবেশ পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণ, জাটকা নিধন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ, খাদ্যের সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তন—সবগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে আসে এবং নদীর মিঠাপানিতে বিচরণ ও প্রজননের সঙ্গে তার জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জড়িত। কিন্তু দেশের অনেক নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে চর ও ডুবোচর।
মৎস্যবিজ্ঞানী ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের মতে, বরিশাল অঞ্চলের নদীমোহনাগুলোতে অসংখ্য চর ও ডুবোচর তৈরি হয়েছে। এতে সমুদ্র থেকে নদীর ভেতরে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, শিল্পায়ন, নদী থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলন এবং উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও ইলিশের আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করছে। 

কমছে ইলিশের খাদ্য

ইলিশের বেড়ে ওঠার জন্য নদী ও মোহনার জলজ খাদ্যশৃঙ্খল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় ইলিশের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এসব খাদ্য উপাদানের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য কমে গেলে ইলিশের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে পদ্মা-মেঘনা মোহনায় ইলিশের খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাংকটনের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর সঙ্গে মাছের আকার ছোট হওয়ার সম্পর্কও দেখছেন গবেষকেরা। 

জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির তাপমাত্রা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইলিশের প্রজনন ও চলাচলের সঙ্গে পানির তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, নদীর প্রবাহ এবং লবণাক্ততার সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসছে। গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং উজান থেকে নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক মাইগ্রেশন বা চলাচল ব্যাহত হতে পারে। 

এছাড়াও নদী ও মোহনায় শিল্পবর্জ্য, নৌযান চলাচল এবং বিভিন্ন ধরনের মানবসৃষ্ট দূষণও ইলিশের আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্রে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে নদীমোহনায় শিল্প স্থাপনা, বালু উত্তোলন ও নৌযানের চলাচল জলজ বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন আনছে। 

জাটকা নিধন এখনো বড় হুমকি

ইলিশের উৎপাদন কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত কারণগুলোর একটি জাটকা নিধন। আইন করে নির্দিষ্ট সময়ে জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। জাটকা বড় হয়ে প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই ধরা পড়লে একটি মাছ থেকে ভবিষ্যতে যে বিপুলসংখ্যক ডিম ও নতুন ইলিশ উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল, তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে স্বল্পমেয়াদে বাজারে মাছ পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। গবেষকেরা বলছেন, শুধু জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিকল্প জীবিকা, নদীতে নজরদারি এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে ইলিশ রক্ষায় মা-ইলিশ ও জাটকা ধরার ওপর নির্দিষ্ট সময় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের কারণে একসময় ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু বর্তমানে শুধু নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ইলিশের জীবনচক্রের সঙ্গে যুক্ত নদী, মোহনা ও সাগরের পরিবেশ একই সঙ্গে সুরক্ষিত না হলে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় মাছ ধরা বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলা কঠিন।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা ইলিশ রক্ষায় কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন। তারা বলছেন জাটকা নিধন বন্ধে নদী ও বাজার—দুই জায়গাতেই নজরদারি বাড়াতে হবে। ইলিশের চলাচলের নদী ও মোহনায় পলি ও ডুবোচরের সমস্যা চিহ্নিত করা। নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া। শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। ইলিশের প্রজনন ও খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নদী ও সাগরে অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে হবে।

তারা বলছেন ইলিশের বর্তমান সংকটকে শুধু ‘মাছ কমে গেছে’—এভাবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। উৎপাদন কমার পাশাপাশি মাছের গড় আকার ও ওজন কমছে, নদীর পরিবেশ বদলাচ্ছে এবং ইলিশের খাদ্যশৃঙ্খলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু জেলেদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। নদী, মোহনা ও সাগরের পুরো বাস্তুতন্ত্রকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের নতুন সমীক্ষা তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সমীক্ষা থেকে যদি উৎপাদন কমার প্রধান কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে নির্দিষ্ট করা যায়, তাহলে সেই অনুযায়ী ইলিশ ব্যবস্থাপনা নীতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। আর এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



আ.দৈ/এসআর











Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝