এডিবির গবেষণা
ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ
বিশেষ প্রতিনিধি

দেশের প্রধান জাতীয় মহাসড়কগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এডিবি’র সহায়তা ও অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় ১৮ মাসে—জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত—দেশের ১০টি জাতীয় মহাসড়কে মোট ৬৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা চট্টগ্রাম- কক্কবাজার মহাসড়কে। এসব দুর্ঘটনায় ৯২৮ জন হতাহত হয়েছেন।
গবেষণায় দুর্ঘটনার সংখ্যার দিক থেকে এর পর রয়েছে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক, যেখানে ৯৮টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে ৭৯টি এবং ঢাকা-আরিচা-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে ৬৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। গবেষণায় এন জাতীয় মহাসড়ক ১, ৮, ২ ও ৫ কে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
মুখোমুখি সংঘর্ষ সবচেয়ে প্রাণঘাতী
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, দুর্ঘটনার ধরন হিসেবে মুখোমুখি সংঘর্ষ সবচেয়ে প্রাণঘাতী। এ ধরনের সংঘর্ষে ২,১২৯ জন হতাহত হয়েছেন, যা মোট হতাহতের ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৬৯৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বড় বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে মোটরসাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৮ মাসে ২৪৭ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। আধা-শহর ও গ্রামীণ এলাকায় পথচারী মৃত্যুর ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দুর্ঘটনা কমাতে যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে
গবেষণার ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে চালকদের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম সড়ক নিরাপত্তা ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষায়িত পুলিশ বিভাগ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। সরকার ডিসেম্বর ২০২৭-এর মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের সড়ক নিরাপত্তা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা জানিয়েছে।
দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন গুরুত্ব
গবেষণাটি শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা গণনা করেনি; দুর্ঘটনার তথ্যকে ভবিষ্যৎ সড়ক পরিকল্পনা ও নকশায় ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধু মামলা বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। দুর্ঘটনার স্থান, কারণ, যানবাহনের ধরন, হতাহতের ধরনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের সড়ক নকশা ও অবকাঠামো উন্নয়নে তা ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সড়কের অবস্থা উন্নত হলেও রক্ষণাবেক্ষণে চাপ
একই সময়ে এডিবিরি আরেকটি গবেষণায় রোডস এন্ড হাইওয়ে বিভাগ এর সড়ক নেটওয়ার্কের অবস্থারও চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর মোট ২২,৭১৯ কিলোমিটার সড়কের ৯১.৪৭ শতাংশকে ভালো বা মোটামুটি ভালো অবস্থায় শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই হার ছিল ৭৩.৭ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ সালে ৮৯.৭ শতাংশ। তবে বড় সড়ক নেটওয়ার্কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। আরডিএইচ এর প্রতিটি সাব-ডিভিশন গড়ে প্রায় ১৮০.৯ কিলোমিটার সড়ক দেখভাল করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সাব-ডিভিশনের আওতায় সড়কের পরিমাণ ৫৬২.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এ কারণে গবেষণায় সড়কের সমস্যা বড় ধরনের ক্ষতিতে পরিণত হওয়ার আগেই শনাক্ত ও মেরামতের জন্য প্রিভেন্টিভ মেইনটেন্যান্স বা প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত মেরামত নিশ্চিত করতে পারফর্মমেন্স বেস মেইনটেনস্যান্স কন্ট্রাক ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোর দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক রুট। ফলে এখানে যানবাহনের চাপ যেমন বেশি, তেমনি বড় বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন একই করিডোর ব্যবহার করে। গবেষণার পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এই করিডোরে দুর্ঘটনার সংখ্যা অন্য জাতীয় মহাসড়কগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তবে শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা দিয়ে কোনো সড়ক কতটা প্রাণঘাতী তা বিচার করা যায় না। দুর্ঘটনার ধরন, যানবাহনের ধরন, সড়কের নকশা, গতি, পথচারীর উপস্থিতি এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে গবেষণায় বলা হয়েছে, সড়ক নিরাপত্তাকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে না দেখে সড়ক পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। বিশেষ করে মহাসড়ক ১, ৮, ২ ও ৫-এর মতো উচ্চঝুঁকির মহাসড়কে দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আ.দৈ/আরএস




















