রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিষেধাজ্ঞার দুই যুগ পরও পলিথিনের দাপট, দূষণের নতুন ফাঁদে বাংলাদেশ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২৩ পিএম  আপডেট: ০৯.০৯.২০২৬ ৭:৩৮ পিএম  (ভিজিট : ৬০)
X

পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অথচ দুই যুগের বেশি সময় আগে নিষিদ্ধ হয়েছিল পলিথিনের ব্যাগ। উদ্দেশ্য ছিল জলাবদ্ধতা, নদী-খাল দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে বাজার, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে ড্রেন, খাল ও নদী—সবখানেই রয়ে গেছে পলিথিনের উপস্থিতি। আইন আছে, অভিযানও হয়; কিন্তু ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং প্লাস্টিক দূষণের বিস্তার এখন দৃশ্যমান আবর্জনার স্তূপ ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে পানি, মাটি, জলজ প্রাণী ও খাদ্যশৃঙ্খলে।

এটির অপব্যবহাওে পরিবেশের উপর কি ধরনের প্রভাব পড়ছে তা সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এর ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে। গত বছর প্রকাশিত একটি জাতীয় পর্যায়ের সিস্টেমেটিক রিভিউতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত ৫০টি ‘পিয়ার রিভিউড’ গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেশের পানি, নদীর তলানি, জলজ প্রাণী, মাছের খাদ্য, সার এবং খাবার লবণসহ বিভিন্ন নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষণায় পলিথিন, পলিপ্রপাইলিন-১, পলিস্টাইরিনকে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিক পলিমারের মধ্যে পাওয়া গেছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাজারের একবার ব্যবহারযোগ্য একটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হলেও সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় পরিবেশে থেকে বড় প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হতে পারে। এসব কণা পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণীর শরীরেও প্রবেশ করছে। ফলে পলিথিনের সমস্যা এখন শুধু সৌন্দর্যহানি কিংবা ড্রেন বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নজির তৈরি করেছিল। শুরুতে কঠোর প্রয়োগে এর ব্যবহার কমেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ায় বাজারে আবারও পলিথিনের বিস্তার ঘটে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে এসেছে। 

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় পলিথিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পথে সস্তা ও সহজলভ্য বিকল্পের অভাব, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, পলিথিনের কম দাম ও সহজলভ্যতা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছে এটিকে এখনো আকর্ষণীয় করে রেখেছে। 

ফলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে অনেক বাজারে ক্রেতার হাতে পণ্য তুলে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় এখনো পলিথিনের ব্যাগ। বিকল্প হিসেবে পাট, কাপড় কিংবা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যাগ থাকলেও সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি এবং সরবরাহও সব জায়গায় সমান নয়। এই বাস্তবতা পলিথিনবিরোধী উদ্যোগকে আরও কঠিন করে তুলছে। 

নদী থেকে খাবারেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশের নদী ও জলজ পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে একাধিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। কর্ণফুলী নদী নিয়ে ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় পানি ও নদীর তলানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়েছে।  দেশের উপকূলীয় পরিবেশ নিয়েও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উপকূলীয় পানি, সৈকতের বালু ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব গবেষণা পলিথিন, পলিপ্রপাইলিন এর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। ফলে প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব শুধু শহরের ডাস্টবিন বা ড্রেনেই আটকে নেই; তা উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে ২০২৫ সালে কর্ণফুলী নদীর পানি ও পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণায় নদীর পানি ও তলানিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায় এবং দূষণের মাত্রাকে ক্যাটাগরি-১ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।  গবেষণার বিষয়ে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্লাস্টিক বিভিন্ন উৎস থেকে পরিবেশে গিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হচ্ছে। তাঁদের গবেষণায় কর্ণফুলীর পানি, পলি ও জলজ প্রাণী—মাছ, কাঁকড়া ও শামুকেও—মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের চিত্র পাওয়া গেছে। এসব কণা বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এছাড়াও ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে একটি জাতীয় পর্যায়ের সিস্টেমেটিক রিভিউয়ের প্রধান লেখক ড. মো. সিমুল ভূঁইয়ার ২০২৪ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত ৫০টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের পানি, পলি, মাছ, কাঁকড়া, শামুক, মাছের খাদ্য, সার, লবণ ও চায়ের মতো বিভিন্ন উপাদানে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ পেয়েছে। গবেষণায় পলিথিন, পলিপ্রপাইলিন-১ এবং পলিস্টাইরিনকে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া পলিমারের মধ্যে পাওয়া যায়। 

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বাংলাদেশে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। গবেষকেরা বিশেষ করে মাছ ও লবণের মতো খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা পর্যালোচনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো—মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি কেবল নদী বা সমুদ্রের পানিতে নয়, মাছসহ জলজ প্রাণী এবং মানুষের ব্যবহৃত কিছু উপাদানেও পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকেরা এ কারণে প্লাস্টিক দূষণকে পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

তারা বলেন, পলিথিন বন্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান, জরিমানা ও জব্দের ঘটনা ঘটলেও গবেষণার ফলাফল বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সস্তা ও সহজলভ্য বিকল্পের বাজার তৈরি, পলিথিন উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে পলিথিন নিষিদ্ধ, অন্যদিকে এর বিকল্প এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল। ফলে শুধু ভোক্তাকে দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ ধরা পড়বে না। উৎপাদক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, বাজার ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোকেই নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

গবেষণার তথ্য বলছে, পলিথিনের একটি ব্যাগ ব্যবহারের পর সেটি চোখের আড়ালে চলে গেলেও পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না। ড্রেন থেকে খাল, খাল থেকে নদী, নদী থেকে মাছ—শেষ পর্যন্ত প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা ঘুরে ফিরে মানুষের জীবন ও খাদ্যব্যবস্থাতেও প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই দুই দশকের বেশি পুরোনো নিষেধাজ্ঞাকে কেবল কাগজে কার্যকর রাখার পরিবর্তে বাস্তবে প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নইলে পলিথিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চললেও দূষণের অদৃশ্য কণা আরও গভীরে ঢুকে পড়বে—পানি, মাটি, প্রকৃতি পেরিয়ে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে।


আ.দৈ/এসআর













Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝