৭৬ বছর পর শক্তিশালী রূপে ফিরছে ‘এল নিনো’ দেশের আবহাওয়ায় বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা
বাড়তে পারে তাপপ্রবাহ, কমতে পারে বৃষ্টি; কৃষিতে প্রভাবের শঙ্কা
শাহীন রহমান

১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে শুরু হওয়া এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, চলতি বছরের শেষভাগে ‘এল নিনো’ অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ)’র সর্বশেষ পূর্বাভাসেও উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীত মৌসুমে খুব শক্তিশালী ‘এল নিনো’ হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৃহস্পতিবারে সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বর্তমান ‘এল নিনো’ ইতিমধ্যে ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। এ বছরের শেষ থেকে ২০২৭ সালের প্রথম দিকে তা সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো ‘দুর্যোগের পূর্বাভাস’ দেওয়া না হলেও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলনিনোর এককভাবে দেশের আবহাওয়া নির্ধারণ করে না; ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা , বঙ্গোপসাগরের অবস্থা, বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহসহ আরও অনেক বিষয় বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করে। ফলে এবারও পরিস্থিতি হতে পারে জটিল ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে আরিজোনা ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদ চৌধুরী এর প্রভাব নিয়ে বলেন, বাংলাদেশে এর মাঝারি প্রভাব পড়তে পারে। প্রভাব অনেকটা নির্ভর করছে এল নিনো কতটা শক্তিশালী হচ্ছে। কখন এটি তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান এল নিনো প্রভাব এর আগেও বাংলাদেশে পড়েছে। বিশেষ করে গত শতাব্দির আশির দশকে ৮২-৮৩ সালে, ৯১-৯২ এবং ৯৭-৯৮ সালে শুষ্কতা ও খরার সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়া ১৯৮৭, ২০১৫-১৬ ও ২০২৩-২৪ সালের ঘটনাগুলো বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টি ও বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশের অতীত আবহাওয়ার তথ্য ও গবেষণায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট ‘এল নিনো’র সঙ্গে দেশে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত ও বেশি তাপমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দেশের পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বৃষ্টির ঘাটতির তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
গরম বাড়ার শঙ্কা
তারা বলেন, ‘এল নিনো’র অন্যতম বড় প্রভাব হতে পারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে শুষ্কতা বাড়তে পারে। বৃষ্টি কমলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমবে, বাড়বে বাষ্পীভবন। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গরমের পরিস্থিতি তৈরি হলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছেন ‘এল নিনো’র প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাত কমতে এবং তাপমাত্রা বাড়তে পারে। তবে ঠিক কোন সময়ে কতটা তাপমাত্রা বাড়বে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাদের মতে বিশ্বের সামগ্রিক তাপমাত্রার ক্ষেত্রেও ‘এল নিনো’ বাড়তি চাপ তৈরি করে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ২০২৭ সালকে উষ্ণতম বছরগুলোর একটি করে তোলার ঝুঁকি রয়েছে। বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত হয়ে উঠতে পারে—দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীনতার পর স্বল্প সময়ে অতিভারী বর্ষণ। এর ফলে একদিকে খরা ও পানির ঘাটতি, অন্যদিকে স্থানীয় জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা কিংবা পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি একই সময়ে তৈরি হতে পারে।
কৃষিতে বাড়তে পারে চাপ
তারা বলছেন দেশে এলনিনো’র সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়তে পারে কৃষিতে। বৃষ্টি কমে গেলে আমন ধানের জমিতে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বেশি থাকলে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাবে। বৃষ্টির সময় ও পরিমাণ অনিয়মিত হলে কৃষকের বপন ও চাষাবাদের সময়সূচিও বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর সেচনির্ভরতা বাড়তে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতির সঙ্গে লবণাক্ততা যুক্ত হলে কৃষির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। গবেষণায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এলনিনো’র সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
শুধু কৃষি নয়, নিরাপদ পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ বাড়বে। শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই শুষ্ক মৌসুমে পানির চাহিদা বাড়তে পারে। দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে। একই সঙ্গে নদী ও জলাধারে পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচ, নৌপরিবহন ও স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাড়ছে উদ্বেগ
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশ একা নয়। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতার আশঙ্কা বাড়ছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্বল বর্ষা, তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির স্থানিক বৈপরীত্যের ঝুঁকি রয়েছে। পাকিস্তানেও তাপমাত্রা ও পানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। শ্রীলঙ্কায় খরা ও পানির সংকটের সম্ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, জলবায়ুজনিত অভিঘাত বিশ্বের বহু দেশে খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে। কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি—সব খাতেই আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বাংলাদেশের জন্য তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু এল নিনো’র মোকাবিলা নয়; বরং এর কারণে তৈরি হতে পারে এমন গরম, বৃষ্টির ঘাটতি, বৃষ্টির অনিয়ম, কৃষি উৎপাদনের চাপ ও পানির সংকট—এসবের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্কের কারণ নেই; তবে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এল নিনো’র একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও এর অভিঘাত নির্ভর করে স্থানীয় আবহাওয়া ও অন্যান্য জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর। বর্তমান পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের শেষভাগে এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পানি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা, কৃষকদের সময়মতো সতর্ক করা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা।
আ.দৈ/এসআর




















