৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ দুদকে
দুবাইয়ে ৭৩ জনের তথ্য পেতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে
আবুল কাশেম:

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, নেতা, ব্যবসায়ী ও সরকারি চাকরিজীবীসহ ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ সংযুক্ত আরব-আমিরাতের দুবাইয়ে অর্থপাচারের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বাংলাদেশী দুর্নীতিবাজ ঋণ খেলাপি ও জনগণের কোটি কোটি টাকা পাচারের সবচেয়ে বেশি নিরাপদ দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব-আমিরাতের দুবাইকে বেছে নিয়েছেন।
এদিকে দুদকের পক্ষ থেকে বিদেশে পাচারকারীদের ধরার জন্য আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৭৩ জনে একটি তালিকা তৈরি করেছে দুদক। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল ও সাবেক পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত,আহসানুল করিম, আনজুমান আরা শহীদ, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বি খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ ওলিউর রহমান, এসএ খান ইখতেখুরুজ্জামান, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজি মোস্তফা ভূঁইয়া প্রমুখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দুদক অনুসন্ধানের স্বার্থে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় একশত ব্যক্তির বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সরকারের কাছে তথ্য ও নথি চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের (ইউএনসিএসি) আওতায় ইউএই সরকারের কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হবে। মূলত এই মাধ্যমেই দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের তদন্তে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য ও নথি আদান-প্রদান করা হয়।
চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন দুবাইয়ের অভিজাত এলাকা দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহতে ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন বলে তথ্য পেয়েছে দুদক। তাদের কেউ কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাও নিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, দুবাইয়ে অর্থপাচারের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে তদন্তকারী দল সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
দুদক ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট ৭৩ ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে তাদের অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুদকের উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে এবং সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমানের সদস্য হিসেবে একটি বিশেষ দল তদন্তটি পরিচালনা করছে।
অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন ৭৩ ব্যক্তিরা হলেন; সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এইচবিএম ইকবাল, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, আহসানুল করিম, আনজুমান আরা শহীদ, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বি খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ ওলিউর রহমান, এসএ খান ইখতেখুরুজ্জামান, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজি মোস্তফা ভূঁইয়া, মনোজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, মো. মাহবুবুল হক সরকার, মো. সেলিম রেজা, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এসইউ আহমেদ, শেহতাজ মুনশি খান, একেএম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, হাসান রেজা মাহিদুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, মোস্তফা আমির ফয়সাল, রিফাত আলী ভূঁইয়া, সালিমুল হক ঈসা/হাকিম মোহাম্মদ ঈসা, সৈয়দ একে আনোয়ারুজ্জামান/সৈয়দ কামরুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, সৈয়দ সাইমুল হক, আবদুল হাই সরকার, আহমেদ সামির পাশা, ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মোহাম্মদ আল রুমান খান, মাইনুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আউয়াল, সাদিক হোসাইন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসাইন, মোহাম্মদ শওকত হোসাইন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসাইন, এমএ হাসেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, সৈয়দ মিজান মোহাম্মদ আবু হানিফ সিদ্দিকী, সায়েদা দুররাক সিন্ডা জারা, আহমেদ ইফফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এমএ সালাম, মো. আলী হোসাইন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভূঁইয়া, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ রোহেন কবির, মঞ্জিলা মুর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সারফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এসব ব্যক্তির পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করেনি দুদক।
দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের সম্পদ নিয়ে এই অনুসন্ধানের সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশনায়। ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সিফোরএডিএস) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্যাক্স অবজারভেটরির উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির মালিকানায় ৯৭২টি সম্পত্তি ছিল। এসব সম্পত্তির নথিভুক্ত মূল্য প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২ সালের মে মাসে প্রকাশিত সিফোরএডিএসের এক গবেষণায় সম্পত্তিগুলোর মূল্য প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বলা হয়েছিল।
গবেষণায় বলা হয়, এসব সম্পত্তির মধ্যে ৬৪টি দুবাই মেরিনায় এবং ১৯টি পাম জুমেইরাহতে রয়েছে। বাংলাদেশিদের মালিকানায় অন্তত ১০০টি ভিলা ও পাঁচটি ভবনের তথ্যও পাওয়া যায়। এ ছাড়া চার-পাঁচজন বাংলাদেশির সঙ্গে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তির যোগসূত্র পাওয়া গেছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
আ. দৈ./একে




















