রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তৃণমূল পুনর্গঠন, নেতৃত্বে রদবদল ও কেন্দ্রীয় কাঠামো ছোট করার চিন্তা
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই বিএনপির কাউন্সিলের প্রস্তুতি
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৯ পিএম   (ভিজিট : ৫৫)
X

দল ক্ষমতায় আসার পর গত ১ সেপ্টেম্বর সারাদেশে আড়ম্বরে ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে বিএনপি। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পর এবারে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দলীয় কাউন্সিল। দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। ডিসেম্বরে মধ্যেই কাউনিন্সলের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কারণে পিছিয়ে তা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে বলেন দলের কাউন্সিল নিয়ে প্রস্তুতি চললেও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে দ্রুতই কাউন্সিল হবে।

দলীয় সুত্রে জানা গেছে চলতি বছরের ডিসেম্বরকে সামনে রেখে শুরু হওয়া পরিকল্পনা এখন কিছুটা বদলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে এগোচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের কাঠামো গোছানোর কাজ শেষ করেই জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে চায় দলটির নীতিনির্ধারকরা। ফলে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল এখন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর একটি বড় রাজনৈতিক আয়োজন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা। কিন্তু সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। পরবর্তী কাউন্সিল ২০১৯ সালে হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলা-গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় এক দশক ধরে জাতীয় কাউন্সিল ছাড়াই চলছে দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কাঠামো। 

এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে কাউন্সিলকে সামনে রেখে ব্যাপক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক আলোচনায় আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাউন্সিল শেষ করার লক্ষ্য সামনে এসেছে। শীতকালকে কাউন্সিল আয়োজনের জন্য অনুকূল সময় এবং তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সাংগঠনিক কাজ শেষ করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।  

জানা গেছে গত জুলাইয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসে। তখন লক্ষ্য ছিল তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে বড় ধরনের সাংগঠনিক পুনর্গঠন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় কাউন্সিলের সময়সূচিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

 এখন ফেব্রুয়ারিকে সম্ভাব্য সময় ধরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে। দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতির সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে যুক্ত করার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় নেতারা সাংগঠনিক সফরে গিয়ে তৃণমূলের অবস্থা পর্যালোচনা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানো, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের কাজ করবেন বলে জানা যাচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও এগিয়ে নেওয়া হবে। 

দলীয় সুত্রে জানা গেছে আসন্ন কাউন্সিলের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হতে পারে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন। কেন্দ্র থেকে কমিটি নির্ধারণের পরিবর্তে তৃণমূলের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে দলের ভেতরে আলোচনা হয়েছে। এর ফলে জেলা, মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্বে কারা কার্যকরভাবে কাজ করছেন, কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি এবং কার সাংগঠনিক সক্ষমতা রয়েছে—এসব বিষয় নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। 

এ জন্য কাউন্সিলের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ও দুর্বল কমিটিগুলো পুনর্গঠনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে কাউকে কাউকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও এসেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়েও নতুন মুখ যুক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পরিকল্পনা রয়েছে।  কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও স্থায়ী কমিটির আকার নিয়েও নতুন করে ভাবা হচ্ছে। দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির আকার ছোট করার চিন্তার কথা উঠে এসেছে।

পাশাপাশি যোগ্যতা, সক্রিয়তা ও সাংগঠনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে নতুন মুখকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার সম্ভাবনাও রয়েছে।  এতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতাদের জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জায়গা তৈরি হতে পারে। তবে কোন পদে কারা আসছেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

মহাসচিব পদ নিয়ে আলোচনা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ সময় বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এ পদে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে রয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। জানা গেছে আগামী কাউন্সিলে মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদেও যোগ হতে পারে নতুন নাম। মহাসচিব পদে আলোচনায় রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, এ জেডএম জাহিদ হোসেন। আবার রুহুল কবির রিজভীরও ভারপ্রাপ্ত থেকে ভারমুক্ত হতে পারেন বলেও আলোচনা চলছে। এছাড়া ১ নম্বর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এবং হাবিবুন্নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে দলের চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের উপর।  

চলতি বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলের নেতৃত্ব কাঠামোতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে কাউন্সিলে মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।  তবে নতুন মহাসচিব কে হবেন বা বর্তমান নেতৃত্বের কারা কোন পদে থাকবেন—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই সম্ভাব্য নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা থাকলেও সেগুলোকে আপাতত সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। 

নেতা কর্মীরা জানিয়েছেন বিএনপির এবারের কাউন্সিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দলটি এবার সরকারে থাকা অবস্থায় কাউন্সিল করছে। এর আগে ২০১৬ সালের কাউন্সিল হয়েছিল দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতির মধ্যে। এবার দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে দল ও সরকারের কাজের মধ্যে সমন্বয় রাখা এবং একই সঙ্গে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।  নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় তাই কাউন্সিলের আগে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, তৃণমূলকে সক্রিয় করা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে ক্ষমতাসীন দলের উপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলাই এবারের কাউন্সিলের বড় লক্ষ্য হতে পারে।

সব মিলিয়ে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের ক্ষেত্রে ডিসেম্বরের পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য সময় সামনে এসেছে। তবে এখনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়নি। তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জেলা-মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের পুনর্গঠন, তৃণমূলের মতামত সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। ফলে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল কবে হবে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, কেমন বিএনপি নিয়ে কাউন্সিল থেকে বের হবে দলটি। 

দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর ক্ষমতায় এসে এবার নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং তৃণমূলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও যুক্ত করার যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলনই শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

আ.দৈ/এসআর



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝