চড়াই উতড়াই পেরিয়ে ৪৯
দীর্ঘ সংগ্রামের পথ শেষে নতুন অভিযাত্রায় বিএনপি
শাহীন রহমান

প্রতিষ্ঠার পর কেটে গেছে ৪৮ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে ক্ষমতা, বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন, নির্বাচন, সংকট, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা দলটি মঙ্গলবার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে আজ।
এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ আর সাফল্যের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দিনটি বাংলাদেশি মানুষের জন্য আনন্দ, উদ্দীপনা ও প্রেরণার।
এদিকে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গত বুধবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।
সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘গণতন্ত্রের মা’ মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
‘উড়াই উড়াই’ সময়ের স্রোতে চার দশকের বেশি পথ পেরিয়ে বিএনপির সামনে এখন নতুন প্রশ্ন: অতীতের রাজনৈতিক অর্জন ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কীভাবে পরিচালনা করবে দলটি? প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এবারের আয়োজনেও সেই অতীত স্মরণ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রভাবনার সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। দলের ঘোষিত কর্মসূচিতে যেমন রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা, তেমনি রয়েছে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ নিয়ে আলোচনা সভা।
১৯৭৮ সালে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিএনপির আত্মপ্রকাশ। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসেন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচন ও সংসদীয় রাজনীতির নানা পর্যায়ে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতেও দলটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে।
তবে বিএনপির ইতিহাস শুধু ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা নির্বাচনী সাফল্যের ইতিহাস নয়; আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক বিরোধ, নেতৃত্বের সংকট এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার অভিজ্ঞতাও এই পথচলার অংশ। দলের নেতারা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে বারবার বলছেন, বহু সংগ্রাম, সংকট ও শোককে ধারণ করেই বিএনপি এত দূর এসেছে।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় দলটির দর্শনের বিবর্তনও লক্ষণীয়। জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি থেকে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’, এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২৭ দফা এবং পরবর্তীতে ৩১ দফা—বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের একটি ধারাবাহিক রূপরেখা তুলে ধরেছে। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ৩১ দফা হচ্ছে সেই ধারাবাহিকতার সম্প্রসারিত রূপ।
৩১ দফায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা এবং জনগণের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়াই তাদের সংস্কার ভাবনার অন্যতম লক্ষ্য।
দলের রূপরেখায় নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে পরপর দুই মেয়াদের সীমা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের বিষয়ও রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগে স্বচ্ছতার কথা বলা হয়েছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তৃত পরিকল্পনা। বিএনপির ৩১ দফায় অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন, প্রবৃদ্ধির সুফলের সুষম বণ্টন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানো, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু, জ্বালানি খাতে সংস্কার এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ অবকাঠামো, নগরায়ণ, আবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাকেও পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জটিলতা, অর্থনীতির চাপ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো দলটির ভবিষ্যৎ সাফল্যের মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে থেকে যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় তার কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে—সেদিকেই থাকবে রাজনৈতিক মহলের নজর।
এদিকে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শুরু হচ্ছে ১ সেপ্টেম্বর। ওইদিন সকাল ৬টায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৯টায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে ফাতেহা পাঠ এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক পোস্টার প্রকাশের পাশাপাশি সারাদেশে বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচিও থাকবে। জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং দলের বিভিন্ন ইউনিট নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনটি হবে ৫ সেপ্টেম্বর। ওইদিন বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা হবে। এতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি থাকবেন; দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় দলের ৪৮ বছরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে নতুন সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার একটি সুযোগ। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই পেরিয়ে এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং উন্নত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি সামনে আনছে।
চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিএনপিকে দিয়েছে বড় একটি সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। একই সঙ্গে সেই ইতিহাস দলটির ওপর তৈরি করেছে বড় দায়িত্বও। জনগণের ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের যে প্রত্যাশা নিয়ে দলটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা বলছে, তার বাস্তবায়নই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে তাই বিএনপির সামনে একই সঙ্গে অতীতের গৌরব ও ভবিষ্যতের পরীক্ষা। দীর্ঘ পথচলার অর্জনকে পুঁজি করে দলটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল দাঁড় করাতে পারে—আগামী দিনের রাজনীতিতে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠবে সেটিই।
আ.দৈ/আরএস




















