রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপালের বন্যা-ভূমিধসের নেপথ্যে কী, বাংলাদেশের কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২০ পিএম  আপডেট: ২৭.০৮.২০২৬ ৭:৩২ পিএম  (ভিজিট : ৭৫)
X

হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। গত বুধবার এই দুর্যোগে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির স্রোত পাহাড়ি নদীতে নেমে আসে। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ মনে করা হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে’র তথ্যসহ বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভূকম্পন-সদৃশ যে সংকেত ধরা পড়েছিল, সেটি মূলত বিশাল বরফ-শিলা ধসের সৃষ্ট কম্পন। 

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় পড়ে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও তলানি নদীতে নেমে এসে প্রবল ডেবরিস ফ্লো তৈরি করে। কোথাও কোথাও এই ধস নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে দেয়; পরে জমে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ভেঙে ডাউন স্ট্রীমে এ ছুটে গিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে। উপগ্রহচিত্রেও হিমবাহের অংশবিশেষ ধসে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

এই ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। হিমালয়ের তাপমাত্রা বাড়ায় হিমবাহ দ্রুত গলছে ও পাতলা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের উচ্চ এলাকায় বরফ ও মাটির স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় হিমবাহ, বরফ-শিলা ও পাহাড়ি ঢাল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। গবেষকরা অবশ্য বলছেন, কোনো একটি দুর্যোগকে সরাসরি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা ঠিক নয়; ভূতাত্ত্বিক গঠন, তাপমাত্রা, বরফ গলার হার, বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। 

তারা বলছেন নেপালে এ ধরনের বিপর্যয় নতুন নয়। ২০২৪ সালে থামে এলাকায় হিমবাহ-হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিমবাহ-সম্পর্কিত ধস থেকে আকস্মিক বন্যা হয়। ২০২৩ সালে সিকিমে দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে হিমবাহ-হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহের পরিবর্তন শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের সমস্যা নয়; নদীর গতিপথ ধরে বহু দূরের জনপদও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। 

বাংলাদেশের এর কি প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশের জন্য এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তঃসীমান্ত নদী-প্রভাব। নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর পানি বিভিন্ন নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের মধ্য দিয়ে গঙ্গা ও অন্যান্য বৃহৎ নদী অববাহিকায় প্রবেশ করে। ফলে উজানে বড় ধরনের আকস্মিক বন্যা হলে ডাউন স্ট্রীমের নদীগুলোর পানি, পলি ও প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে এবারের নেপাল দুর্যোগের পানি সরাসরি বাংলাদেশে বড় বন্যা সৃষ্টি করবে এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের বন্যার ওপর স্থানীয় ভারী বৃষ্টি, ভারতের উজানের নদীগুলোর পানি এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সামগ্রিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশের বড় নদীগুলোর প্রবাহের বড় অংশ দেশের বাইরে থেকে আসে। ফলে হিমালয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক নদীপ্রবাহের তথ্য বাংলাদেশের আগাম বন্যা সতর্কতায় গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের বড় বন্যাগুলোতেও উজানের বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধির ভূমিকা ছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার উজানের পানি দ্রুত বাড়ার সঙ্গে দেশের ব্যাপক বন্যার সম্পর্ক ছিল। 

তবে নেপালের বর্তমান ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি আতঙ্কের কারণের চেয়ে সতর্কতার বার্তা বেশি। হিমালয়ের হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ, ভূমিধস এবং নদীর ওপর প্রাকৃতিক বাঁধের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নেপাল, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে রিয়েল-টাইম বৃষ্টিপাত, নদীর পানি, হিমবাহ-হ্রদ ও ভূমিধসের তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু বন্যার পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়; হিমবাহ-হ্রদ, ভূমিধস, এবং বরফ-শিলা ধস-এর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকেও আঞ্চলিক বন্যা পূর্বাভাসের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ হিমালয়ে একটি ছোট বরফধস কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশাল ডেবসির ফ্লো হয়ে নদীপথে নেমে আসতে পারে।

তিব্বত-নেপাল সীমান্তে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যার পর গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ২৭ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ভেরিফায়েড আইডিতে একটি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছেন আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ লিখেছেন, ‘তিব্বত-নেপাল সীমান্তে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পানি ভোটি কোশি ও ত্রিশুলি নদী হয়ে নারায়নি-গন্ধক নদীব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতের বিহার রাজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন এরই মধ্যে গন্ধক নদীর ভাটি এলাকায় সম্ভাব্য আকস্মিক পানি বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। বিহার রাজ্য সরকারও ভালমিকিনাগরের গন্ধক বাঁধের ৩৬টি গেট (সব কয়টি গেট) খুলে দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন নেপালের পানি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো একক পথে আসে না। নেপালের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানি ভারতের উত্তরাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। বিশেষ করে নেপালের নারায়ণী নদী ভারতের গণ্ডক নদীর সঙ্গে যুক্ত এবং এই নদী বিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে নেপালে অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক বন্যা হলে প্রথমে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের নদীগুলোতে পানির চাপ বাড়তে পারে।  এরপর বৃহত্তর গঙ্গা নদী অববাহিকায় পানি বাড়লে তার একটি অংশ বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নেপালের বন্যার পানি বাংলাদেশে পৌঁছাবে কি না এবং পৌঁছালে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বন্যার পানির পরিমাণ, নদীর প্রবাহ, ভারতের বিভিন্ন নদীর পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের ওপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই নেপালের বন্যাকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বড় বন্যার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটিকে উজানের পানি বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করে নদীগুলোর পানি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

তারা বলছেন নেপালের বন্যার পানি যদি গঙ্গা নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তাহলে প্রথমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জসহ পদ্মা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। নদীর পানি বাড়লে চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী নিচু এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। তবে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যার ঝুঁকির সঙ্গে নেপালের বন্যাকে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না। নেপালের এই বিপর্যয় তাই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি শুধু দেশের ভেতরের বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। হিমালয়ের বরফ, পাহাড় ও নদীতে কী ঘটছে, সেটিও বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।



আ.দৈ/এসআর










Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝