রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় পথ দেখাবে রুফটপ সোলার!
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৬:২৯ পিএম   (ভিজিট : ৬১)
X

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমদানি করা গ্যাস, এলএনজি ও তেলনির্ভরতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ, বিশেষ করে রুফটপ সোলারকে সামনে আনা হয়েছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ছয় মাসে রুফটপসহ সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার জ্বালানী সংকট মোকাবেলায় বিকল্প বিদ্যুত ব্যবহাওে দিকে নজর দিচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ সংকট ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সৌরবিদ্যুৎ এখন আর শুধু বিকল্প জ্বালানি নয়; অনেক দেশ এটিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত করছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৭০০ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে এবং মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৩ টেরাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

তাদেও মতে, রুফটপ সোলারের বড় সুবিধা হলো এর জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই। শিল্পকারখানা, তৈরি পোশাক কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল ও আবাসিক ভবনের বিশাল ছাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। দিনের বেলায় যখন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে, তখন ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমে এবং গ্যাস বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনও কমে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎব্যবস্থার ভিত্তিও তৈরি করছে।

সরকার ২০২৫ সালে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও এর বাস্তবায়ন নির্দেশিকা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রুফটপের পাশাপাশি বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পেও জোর দেওয়া হচ্ছে। রুফটপ সোলার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, ঢাকার বিপুলসংখ্যক ভবনের ছাদ এখনো যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। ঢাকার প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সম্ভাব্যভাবে প্রায় ৬ হাজার ৯৪৯ মেগাওয়াট ডিসটিবিউটেড সোলার স্থাপন করা যেতে পারে।

জানা গেছে সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি করেছে। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই সৌরভিত্তিক এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ফলে আগের তুলনায় প্রতি ইউনিটে উৎপাদন ব্যয় কমেছে এবং বছরে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের প্রত্যাশা করছে সরকার। রুফটপ সোলার ব্যবহারের বিষয়ে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য লাভজনক, কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি ব্যয় কমবে। 

এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়াতে সারা দেশে নতুন উদ্যোক্তা ও সার্ভিস প্রোভাইডার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে জেলা ও ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বৃহস্পতিবার সারা দেশে একযোগে সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত সার্ভিস প্রোভাইডাররা স্থানীয় পর্যায়ে রুফটপ সোলারসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও ব্যাবসায়িক প্যাকেজ, গ্রাহকসেবা এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দেবে।

জানা গেছে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎকেও সম্ভাবনাময় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় অনশোর ও অফশোর উইন্ড প্রকল্পের সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে বায়ু, সৌর, বায়োমাস, বায়োগ্যাস, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ এবং জলবিদ্যুৎ—সবগুলো উৎসকে নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য বায়োমাস ও বায়োগ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ধানের তুষ, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের বর্জ্য, পশুর গোবর এবং অন্যান্য জৈব বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে পৌর বর্জ্য, চিকিৎসা ও শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন যুক্ত করার পরিকল্পনাও নীতিতে রয়েছে। ইনসিনারেশন, গ্যাসিফিকেশন, পাইরোলাইসিস ও বায়ো-ফারমেন্টেশনের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে। 

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশল নিয়েও রুফটপ সোলারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর ও নীতিগত সুবিধার কথা বলা হয়েছে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই রূপান্তরের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সৌরবিদ্যুতের অনিয়মিত উৎপাদন। দিনে সূর্যের আলো থাকলেও রাতে সোলার বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ফলে বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে হলে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ, উন্নত সঞ্চালনব্যবস্থা এবং আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি, বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। 

সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য রুফটপ সোলার একটি দ্রুত ও বাস্তবসম্মত পথ। তবে এটি একক সমাধান নয়। রুফটপ ও বৃহৎ সৌর প্রকল্পের সঙ্গে বায়ু, বায়োমাস, বায়োগ্যাস, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণকে সমন্বিত করতে পারলেই আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সরকারের বর্তমান নীতিগত পদক্ষেপগুলো সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য স্পষ্ট শিক্ষা হলো শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, রুফটপ সোলার, সৌর সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বড় সোলার পার্ক এবং ব্যাটারি স্টোরেজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা ও সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে দ্রুত সোলার স্থাপন করা গেলে নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ব্যাটারি ও আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সৌরবিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আ.দৈ/এসআর



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝