ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গুম,খুন ও নির্যাতীতদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন অধিদপ্তর হচ্ছে
আবুল কাশেম:

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা ১৭ বছর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপি,জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মসলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতা কর্মীদের নির্বিচারে গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে। অনেকের স্বজনরা তাদের লাশটি পর্যন্ত খুঁজে পায়নি বলেও বেশ কিছু ঘটনার তথ্য উপাত্ত বেরিয়ে আসছে।
আরো অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা স্থায়ী করার জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। সরকার বিরোধী মতের রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের জোরপূর্বক ধরে নিযে অমানবিক নির্যাতন,গুম, খুন, মিথ্যে মামলায় বছরের পর বছর কারাগারে আটকে রাখা হতো। এমনকি যখন তখন ধরে নিয়ে টর্চারসেল বরে খ্যাত আয়নাঘরে দিনের পর দিন নির্যাতন চালানো হতো।
শুধুতাইনয় শেখ হাসিনা ও তার নেতাদের নির্দেশে অনেকে ধরে নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড/ ক্রস ফায়ার দেওয়া হতো বলেও অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুলুম নির্যাতনের এক পর্যায়ে ২০২৪ সালে সারাদেশে ছাত্র জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে ওই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে জীবনের বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছে।
ছাত্র জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়, অনেক মন্ত্রী ,এমপি, নেতা-কর্মী ও পুলিশ প্রশাসনের অনেকে লোকজন আত্মগোপনে চলে যায়। আর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতের দিল্লীতে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো তারা দেশের বাইরে অবস্থান করেই দেশের বিরুদ্ধে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছেন এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা করছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অধিদপ্তরের কাজ হবে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সারাদেশে নির্বিচারে গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার ব্যক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কল্যাণ, চিকিৎসা, আইনি সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
আজ রোববার (২৩ আগস্ট) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে সভায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
ওই সভায় আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে। একইভাবে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন, কেউ নির্মম হত্যাকাণ্ড বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়ে আর পরিবারের কাছে ফিরে আসেননি। অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা অসংখ্য মিথ্যা মামলায় সর্বস্ব হারিয়ে বছরের পর বছর কারাভোগ করেছেন। এসব মানুষের ত্যাগকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি যাতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে না পারে এবং কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, মানবাধিকার রক্ষা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ২০০৯ সালের পর ভোটাধিকার হরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের সেই আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, গুম হয়েছেন কিংবা আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের রয়েছে। সভায় ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর ‘সিডিউল-১ (অ্যালোকেশন অব বিজনেস)’ সংশোধনের মাধ্যমে নতুন এই দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এ ছাড়া জাতিসংঘের ‘বেসিক প্রিন্সিপলস অ্যান্ড গাইডলাইনস অন দ্য রাইট টু আ রেমেডি অ্যান্ড রিপারেশন’ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
সভায় তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে—মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, গুম-খুন-নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর সংশ্লিষ্ট সিডিউল সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের তালিকায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, আইন ও বিচার, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, যুব ও ক্রীড়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আ. দৈ./একে




















