রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইনভেস্ট বাংলাদেশ’র যাত্রা শুরু
বিনিয়োগের এক দরজায় কতটা বদলাবে দেশের ব্যবসার পরিবেশ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুধু সংস্থা একীভূত করলেই হবে না, দরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বহু প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কমানো
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ৫৯)
X


বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে হাঁটল সরকার। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) একীভূত করে গঠন করা হয়েছে নতুন প্রতিষ্ঠান ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’। ২০ আগস্ট গেজেট প্রকাশের পর ২৩ আগস্ট থেকে নতুন কাঠামোয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এর লক্ষ্য বিনিয়োগকারীর জন্য আলাদা আলাদা সরকারি দপ্তরের দরজায় ঘোরার প্রয়োজন কমিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা দেয়া। বিনিয়োগ অনুমোদন, নিবন্ধন, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি, বিভিন্ন লাইসেন্স ও পারমিট, বিনিয়োগ প্রণোদনা, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের সহায়তা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোকে একই ছাতার নিচে আনার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অন্যতম বড় সমস্যা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা অনেকটাই কমবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নতুন প্রতিষ্ঠানটি অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীর সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে পারে তার ওপর

এক দরজায় বিনিয়োগের সেবা

নিয়ম অনুযায়ি দেশে নতুন একটি শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকে একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। কোম্পানি নিবন্ধন, কর, কাস্টমস, পরিবেশ ছাড়পত্র, জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, বিভিন্ন লাইসেন্স ও অন্যান্য অনুমোদনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ফলে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে, বাড়ে ব্যয় ও অনিশ্চয়তা। নতুন ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর অন্যতম লক্ষ্য এই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা। বিনিয়োগকারীর জন্য একটি সমন্বিত বা ‘ওয়ান-স্টপ’ কাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন সরকারি সেবা একই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আইনে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবার জন্য সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে কোনো আবেদন কোন পর্যায়ে আটকে আছে, তা শনাক্ত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স ও অনুমোদনের জন্য একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। এর সঙ্গে বাংলাবিজ এর মতো ডিজিটাল উদ্যোগকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন নতুন ব্যবস্থায় শুধু বিদেশি বা দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনাকেও একই কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, ফ্রি ট্রেড জোন ও ঘোষিত শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ, জমি বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা সমন্বয়ের মাধ্যমে দেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বিনিয়োগকারী কোথায় কারখানা করবেন, কী ধরনের সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে অনুমোদন পাবেন—এসব বিষয়ে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামো থেকে নির্দেশনা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন কর্তৃপক্ষের সমন্বয় ভূমিকা থাকবে। সরকার আশা করছে, এতে বড় প্রকল্পে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়বে।

বিনিয়োগকারীর জন্য কতটা সুবিধা?

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা সময় ও খরচ কমানো। একজন বিনিয়োগকারী যদি একটি কারখানা স্থাপনের জন্য একই তথ্য বারবার বিভিন্ন দপ্তরে জমা না দিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এগোতে পারেন, তাহলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে। দ্বিতীয়ত, অনুমোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা কার্যকর করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সম্পর্কে বিনিয়োগকারীর পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে। তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে একটি ‘এক দরজার’ বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হবে। বিনিয়োগকারীকে আলাদা করে একাধিক কর্তৃপক্ষের কাঠামো বুঝতে হবে না।

 চতুর্থত, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগ আকর্ষণের কার্যক্রম একই কাঠামোয় আসায় বিনিয়োগ প্রস্তাব থেকে বাস্তব প্রকল্পে যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিনটি সংস্থা একীভূত করাই বাংলাদেশের বিনিয়োগ সমস্যার সমাধান নয়। সাবেক বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলামের মতে, নতুন প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করবে এটি বিনিয়োগকারীর সমস্যার কতটা দ্রুত সমাধান করতে পারে এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে তার ওপর।

সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও মনে করেন, সংস্থা একীভূত করা ইতিবাচক হলেও এটি ব্যবসার পুরো পরিবেশ সংস্কারের বিকল্প নয়। বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তে করব্যবস্থা, কাস্টমস, লজিস্টিকস, জ্বালানি সরবরাহ এবং নীতির স্থিতিশীলতা বড় ভূমিকা রাখে। পলিসি একচেঞ্জ বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজের পর্যবেক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সেবা এখনো ৫০টির বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তিনটি সংস্থা একীভূত করলেও যদি বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের জটিলতা একই থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীর ভোগান্তি পুরোপুরি দূর হবে না।অর্থাৎ, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগকারীর যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাকেও একই সময়সীমা ও সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা।

ঘোষণার চেয়ে বাস্তব বিনিয়োগই সাফল্যের মাপকাঠি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো ঘোষিত বিনিয়োগ ও বাস্তবে আসা বিনিয়োগের পার্থক্য। কোনো বিনিয়োগকারী আগ্রহ প্রকাশ করলেই তা বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত হয় না। অর্থনীতিবিদ ফেরদৌস আরা বেগম মনে করিয়ে দিয়েছেন, নতুন প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু কতটি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বা কতটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে কত টাকা বাস্তবে বিনিয়োগ হলো, কত নতুন কারখানা স্থাপিত হলো, কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো, কত প্রযুক্তি এল এবং রপ্তানি কতটা বাড়ল।

দেশে গত ২৫ সালে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও নতুন ইকুইটি ইনভেস্ট বা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-কে শুধু বিনিয়োগ আহরণের প্রচারমূলক প্ল্যাটফর্ম না হয়ে বাস্তব বিনিয়োগ বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই হবে বড় পরীক্ষা।

১৮০ দিনের সংস্কার কর্মসূচি

নতুন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ১৮০ দিনের সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে। ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, ডিজিটাল সেবা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীর জন্য একক ব্যবস্থাকে কার্যকর করাই এর অন্যতম লক্ষ্য। তবে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর দেশে বিনিয়োগ করতে একজন উদ্যোক্তার বাস্তবে কতটা কম সময়, কম খরচ ও কম দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। যদি ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেই পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে এটি দেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থায় একটি বড় বাঁক হতে পারে। আর যদি শুধু পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামো বদলে নতুন নাম দেয়া হয়, তাহলে কাঙ্খিত পরিবর্তন আসবে না। তাই সামনে জন্য আসল পরীক্ষা একটাই ‘এক দরজা’ শুধু কাগজে থাকবে, নাকি বিনিয়োগকারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাতেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

আ.দৈ/এসআর




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝