
একসময় রাজবাড়ীর নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয় ছিল দেশি মাছের সমৃদ্ধ ভান্ডার। কই, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদাসহ নানা প্রজাতির মাছ সহজেই মিলত এসব জলাশয়ে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের বিরূপ প্রভাব, জলাশয় ভরাট এবং মাছের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে অনেক দেশি মাছ হারিয়ে যেতে শুরু করে।
এর সঙ্গে চায়না দুয়ারী বা কারেন্ট দুয়ারী জালের অবাধ ব্যবহারও দেশি মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে। নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে প্রজননক্ষম মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির পোনা ও জলজ প্রাণীও নিধন হতে থাকে।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছর ধরে জেলা মৎস্য বিভাগের নানা উদ্যোগ এবং চাষিদের আগ্রহে বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে বদ্ধ জলাশয় ও পুকুরে দেশি মাছ চাষ বাড়ায় স্থানীয় বাজারেও এসব মাছের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীতে নদী, বিল, প্লাবনভূমি, পুকুর, হাওর-বাওরসহ মৎস্য উৎপাদন ও প্রজননক্ষেত্রের মোট আয়তন প্রায় ৪৪ হাজার ৮৮১ হেক্টর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে জেলায় বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ২৫২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। বিপরীতে জেলার মাছের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২২ হাজার ২৩৯ দশমিক ৮৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১১ হাজার ১২ মেট্রিক টন বেশি মাছ উৎপাদন হচ্ছে, যা জেলার চাষিরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন।
দেশি মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলায় ছয়টি অভয়াশ্রমও গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে গোয়ালন্দে একটি, কালুখালীতে দুটি, পাংশায় একটি এবং বালিয়াকান্দিতে দুটি অভয়াশ্রম রয়েছে।
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও দেশি কই, শিং, মাগুর, টেংরা ও পাবদার মতো মাছের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এখন আধুনিক চাষপদ্ধতির কারণে পুকুরেও এসব মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে দেশি মাছের উপস্থিতিও বাড়ছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ বলেন, অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পর নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সেখানে প্রজননক্ষম মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এতে দেশি মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন বাড়ছে এবং এর সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় মৎস্যজীবী ও চাষিরা।
তিনি জানান, বিশেষ করে দেশি কই, শিং, মাগুর, বাইন, গুতুম, চান্দা, টেংরা, পাবদা, ঢেলা ও মলা মাছের চাষ বাড়ছে। ফলে বাজারে এসব মাছের সরবরাহও আগের তুলনায় বেড়েছে।
দেশি মাছের উৎপাদন ও সংরক্ষণে অভয়াশ্রম তৈরির পাশাপাশি পোনা অবমুক্তকরণ, চাষিদের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্নভাবে তাদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ চলছে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা অনেক প্রজাতির মাছ আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশি মাছের উৎপাদন বাড়লে শুধু মানুষের আমিষের চাহিদাই পূরণ হবে না, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মাংসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল হক বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষার পাশাপাশি বদ্ধ জলাশয় ও পুকুরে দেশি প্রজাতির মাছ চাষে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে দেশি মাছের উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে মৎস্য খাতে কর্মসংস্থান ও চাষিদের আয়ও বাড়ছে।
প্রাকৃতিক জলাশয় রক্ষা, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং আধুনিক চাষপদ্ধতির বিস্তার—এই তিনটি উদ্যোগ সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে রাজবাড়ীতে হারিয়ে যেতে বসা দেশি মাছের অনেক প্রজাতিই আবার ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলার মৎস্যসম্পদের এই নতুন সম্ভাবনা তাই শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সুত্র বাসস




















