মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ২৫ এজেন্সি নতুন সিন্ডিকেট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিনিধি

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগে আশার পাশাপাশি নতুন বিতর্ক । ২৫ এজেন্সির তালিকা ঘিরে প্রশ্ন । অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ঠেকাতে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার দাবি
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলে দেয়ার উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন বিদেশগামী কর্মপ্রত্যাশীরা। তবে বাজার চালুর আগেই নির্দিষ্ট ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে ঘিরে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএসে বাংলাদেশি ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের পরই প্রশ্ন উঠেছে এটি কি কেবল প্রাথমিক বাছাই, নাকি আবারও সীমিতসংখ্যক এজেন্সির হাতে পুরো শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া?
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশের অর্থ এই নয় যে তারাই চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর একমাত্র অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া, সময়সূচি, ব্যয় এবং দুই দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা এখনো চূড়ান্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে। ফলে শ্রমবাজারটি কী কাঠামোয় চালু হবে, সে সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন শঙ্কা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। ২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে বাজার চালু হওয়ার পর অনিয়ম ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক সই হয়।
এরপর ২০২২ সালে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবারও বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো শুরু হয়। পরে এজেন্সির সংখ্যা ১০১টিতে উন্নীত হলেও কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ১ জুনের পর বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।
ওই সময় নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় কর্মীদের কাছ থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। অনেক কর্মী ঋণ করে বিদেশ যাওয়ার পর উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের চাপে পড়েন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে না পারায় তৈরি হয় আরও জটিলতা। এবার তাই সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কি নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে, নাকি পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন নামে ফিরে আসবে?
২৫ এজেন্সি নিয়ে যত প্রশ্ন
মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে প্রকাশিত ২৫টি এজেন্সির তালিকা সামনে আসার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করে তালিকা দিতে বলেছিল। শর্তগুলোর মধ্যে গত পাঁচ বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও নির্দিষ্ট আয়তনের স্থায়ী অফিস থাকার মতো বিষয় ছিল।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানানো হয়। পরে যোগ্যতার বিভিন্ন মানদণ্ড পূরণকারী ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। সেই তালিকা থেকে এখন ২৫টি এজেন্সির নাম প্রকাশ পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন এত বড় তালিকা থেকে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হলো।
তবে তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সিন্ডিকেট প্রমাণিত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এ তালিকা কোন উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, এজেন্সিগুলো কী ধরনের অনুমোদন পাবে এবং অন্য বৈধ এজেন্সিগুলোর জন্য ভবিষ্যতে সুযোগ থাকবে কি না এসব বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
১৭ কোটি টাকার অভিযোগ
এর মধ্যেই ২৫টি এজেন্সিকে ঘিরে কথিত সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ আরও বিতর্ক তৈরি করেছে। বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছে, তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতি এজেন্সির কাছ থেকে ১৭ কোটি টাকা এবং কর্মীপ্রতি ৫ হাজার রিঙ্গিত নেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটির দাবি, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করা হলে একজন কর্মীর মালয়েশিয়া যেতে ৪ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এতে কর্মীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সিন্ডিকেট নয়, উন্মুক্ত বাজারের দাবি
বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদসহ অভিবাসন খাতের বিভিন্ন পক্ষের মূল দাবি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, নেতা, ব্যবসায়ী, দালালচক্র কিংবা নির্দিষ্টসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে দেয়া যাবে না। তাদের মতে, সরকারি জি-টু-জি ও বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত রাখা উচিত। এজেন্সি নির্বাচনে সবার জন্য অভিন্ন ও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকার মধ্যে রাখার দাবি উঠেছে। ভিসা, প্রসেসিং, মেডিকেল, বিমানভাড়া ও অন্যান্য খাতে প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের পাশাপাশি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের তথ্যও প্রকাশের দাবি রয়েছে।
সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত চালু করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা। কারণ বাজার খুলে দেয়া হলেও যদি বিদেশ যেতে কর্মীদের কয়েক লাখ টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে এর সুফল শেষ পর্যন্ত কর্মীদের বদলে মধ্যস্বত্বভোগী ও সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ীর হাতে চলে যেতে পারে। এ কারণে সরকারের সামনে এখন দুটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূণ একদিকে দ্রুত শ্রমবাজার চালু করা, অন্যদিকে অতীতের অনিয়ম যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
কর্মী বাছাইয়ে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থের বিনিময়, প্রভাব-তদবির কিংবা দালালচক্রের মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধের দাবিও উঠেছে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে প্রবাসী অধিকার পরিষদ।
সামনে বড় প্রশ্ন
সব মিলিয়ে ২৫ এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এর মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন শ্রমবাজারটি কি এবার সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে, নাকি সীমিতসংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণেই থাকবে? সরকার যদি সব বৈধ ও যোগ্য এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত নীতিমালা তৈরি করে, কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং প্রতিটি ধাপে সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করে, তাহলে দীর্ঘদিনের বন্ধ বাজারটি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ২৫ এজেন্সির তালিকাই যদি কার্যত শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং কথিত আর্থিক লেনদেন ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অতীতের সংকট আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে। তাই এখন কর্মপ্রত্যাশী লাখো মানুষের প্রশ্ন একটাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলবে, কিন্তু সেটি কি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হবে, নাকি আবারও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন করে চালু হতে যাওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সত্যিকারের সুযোগ হয়ে উঠবে, নাকি পুরোনো সংকটের নতুন অধ্যায় শুরু করবে। “মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হবে কর্মীদের জন্য—কোনো সিন্ডিকেটের জন্য নয়” এই অবস্থান জানিয়ে প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় আপসহীন থাকার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ প্রবাসী অধিকার পরিষদ।
এদিকে জনশক্তি রফতানির সাথে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকাকে ‘নতুন সিন্ডিকেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক বলেছেন, বাংলাদেশের দিক থেকে বোয়েসেলই কাজটা করবে এবং তাতে দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিই কর্মী পাঠানো সুযোগ পাবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা’র সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু নিয়ে আসলে কী করা হচ্ছে সে সম্পর্কে এখনো কোনো তথ্য তাদের কাছে পোৗঁছায়নি এবং বিষয়টি জানতে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করছেন তারা।
আ.দৈ/আরএস




















