শর্তের বেড়াজালে আটকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর
শাহীন রহমান

হাসিনার প্রত্যর্পণ, ‘অনুকূল পরিবেশ’ ও সম্পর্ক পুনর্গঠন নিয়ে টানাপোড়েন । ঢাকা চাইছে দৃশ্যমান অগ্রগতি, দিল্লি বলছে আইনি প্রক্রিয়ার কথা । শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণা প্রত্যাহারে বাড়ল জল্পনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন এক সমীকরণের মুখে। একদিকে ভারত চাইছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের টানাপোড়েন কমিয়ে সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে। অন্যদিকে ঢাকা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে শুধু আনুষ্ঠানিক সফর নয়, সফরের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আরও কয়েকজন পলাতক আসামীকে ফেরত দেয়া এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়টিও সামনে এনেছে। ভারতের কাছে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ চেয়ে ঢাকা এখন দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
ফলে তারেক রহমানের দিল্লি সফর এখন আর নিছক একটি সৌজন্য বা দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে শনিবার কথা বলেছেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই, আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করে উপযুক্ত সময়ে এ সফর হবে। ‘ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ। ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। তবে ভারতসহ কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করা হবে না।
এ সময় তিনি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উল্লেখ করেন। বলেন শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়া একজন সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং কয়েকটি মামলার রায়ও হয়েছে। আরও কিছু মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার বিষয়টি নতুন কোনো সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে চলমান একটি বিষয়।
গত ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এ লক্ষ্যে ভারতকে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের কথাও বলা হয়েছে।
ঢাকার এই অবস্থানের পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দেয়া বক্তব্যকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুতরভাবে দেখা হয়েছে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থানরত একজন দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে। এরপর থেকেই তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা চললেও ঢাকার পক্ষ থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতির দাবি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ভারতের বক্তব্যের মূল সুর হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ রাজনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় নয়; এটি ভারতের প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হওয়ার বিষয়। ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার আওতায় বিবেচিত হবে এবং বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে নিষ্পত্তি করা যাবে না।
অর্থাৎ, ঢাকার রাজনৈতিক প্রত্যাশার বিপরীতে দিল্লি বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে। তবে একই সঙ্গে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘায়িত করতে চাইছে না। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানেই মূল কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব। ঢাকার কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি রাজনৈতিক ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন; দিল্লির কাছে এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার জায়গা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সফরের অনিশ্চয়তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় গত শুক্রবার। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এমন একটি ঘোষণা আসে, যা দেখে মনে হয় তারেক রহমানের দিল্লি সফর প্রায় নিশ্চিত। পরে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা তৈরি হয়। রয়টার্সের ২১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট তারেক রহমানের ভারত সফরের কথা প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো সফরটি নিশ্চিত করেনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সফরের প্রস্তুতি থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতার জায়গাটি পুরোপুরি তৈরি হয়নি। তবে পুরো আলোচনা কেবল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে ঘিরে দেখলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণটি বাদ পড়ে যায়। গত দুই বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার সেই সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে চাইলেও ‘সমমর্যাদা’, সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে দিল্লিও দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে অচলাবস্থায় রাখতে চাইবে না। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসএর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেকটা দূরে থাকলেও দিল্লি-ঢাকার মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলছে এবং সম্পর্ককে এই ‘সর্বোচ্চ দাবির’ অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো তারেক রহমানের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে আসলে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক দর-কষাকষি চলছে। রয়টার্স সফরটির অনিশ্চয়তাকে হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সফরের আগে আরও অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ চায় এবং ভারতীয় জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য আরও সরাসরি। টাইমস অব ইন্ডিয়া বাংলাদেশের অবস্থানকে ‘কঠিন শর্ত’ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং বলেছে, দিল্লির পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এসব শর্ত পূরণ করা কঠিন। একই সঙ্গে ভারতীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলন ও দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে; সফরের সময় নির্ধারণ এখন ঢাকার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের ভারত সফর এখন তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের অবস্থান, সফরের জন্য কাঙ্খিত ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের রূপরেখা। ঢাকা চাইছে, সফরটি যেন শুধু ছবি তোলা ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি আসে। দিল্লি চাইছে, নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হোক এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলেই রাখা হোক।
শেষ পর্যন্ত সফরটি কবে হবে, সেটি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো সফরের আগে ঢাকা ও দিল্লি কতটা সমঝোতার জায়গায় পৌঁছাতে পারে। যদি প্রত্যর্পণসহ স্পর্শকাতর ইস্যুতে কোনো মধ্যপন্থা তৈরি হয়, তাহলে তারেক রহমানের দিল্লি সফর দুই দেশের সম্পর্কের ‘রিসেট’ বা নতুন সূচনার বার্তা দিতে পারে। আর সমঝোতা না হলে সফর পিছিয়ে গিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তিকর অবস্থাই আরও কিছুদিন বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আ.দৈ/আরএস




















