বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির সংবিধানিক ক্ষমতা কতটুকু
শাহীন রহমান

দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি এ পদে নির্বাচিত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি আগামী পাঁচ বছরের জন্য এ পদের দায়িত্ব পালন করবেন। তবে সংবিধান অনুযায়ী তার ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংবিধানে তার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি। সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন, ক্ষমতা ও কার্যাবলি, ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ, রাষ্ট্রপতির অন্যান্য নিয়োগ এবং রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও অপসারণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক প্রকৃতির। মুলত নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।
৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংবিধান ও আইনের অধীন থেকে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এই অনুচ্ছেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।
৪৯ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শনের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষমা করতে, স্থগিত রাখতে বা কমিয়ে দিতে পারেন। এটি রাষ্ট্রপতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সাংবিধানিক ক্ষমতা।
৫০ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন। মেয়াদ শেষ হলেও উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন।
৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক দায়মুক্তি প্রদান করেছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালন বা দায়িত্ব পালনের দাবিতে কোনো কাজের জন্য আদালতে জবাবদিহির আওতায় পড়েন না। তবে সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে তাঁকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অপসারণের ব্যবস্থা রয়েছে।
৫২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের বিধান রয়েছে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সংসদ নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ জবাবদিহির বাইরে নন; তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংবিধান নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।
৫৩ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি শারীরিক বা মানসিকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে তাঁকে অপসারণের সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিলে সংবিধান একটি নির্দিষ্ট সমাধানের পথ দিয়েছে।
৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে, অথবা রাষ্ট্রপতি অনুপস্থিতি, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ সাময়িকভাবে শূন্য বা রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলেও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তাঁর ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সমতুল্য নয়। বিশেষ করে ৪৮ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নিজ উদ্যোগে সরকারের দৈনন্দিন নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না।
তবে রাষ্ট্রপতির পদকে কেবল আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, দণ্ড মওকুফ বা হ্রাস এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির পদকে একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রেখেছে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী হলেও সংসদীয় সরকারব্যবস্থার কারণে তাঁর অধিকাংশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। একই সঙ্গে সংবিধান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ, দায়মুক্তি, অভিশংসন, অসামর্থ্য এবং অনুপস্থিতির সময় দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা সংবিধান দ্বারা সুস্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত।
আ. দৈ,/এক/ এসআর




















