৩৫ বছর পর ভোট কাল
ফল নিশ্চিত হলেও দেশবাসির নজর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে
মুখোমুখি মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদ, রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে কৌতূহল
শাহীন রহমান

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা বাড়ছে। কারণ, ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থিকে নিয়ে ভোট হতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে ২০ আগস্ট সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় পার হওয়ার পর এ তথ্য নিশ্চিত করেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। এবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিএনপি মির্জা ফখরুলকে দলীয় প্রার্থি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট অলি আহমদকে প্রার্থি করেছে।
দুই প্রার্থির মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়। যদিও সংসদে সংখ্যার বিচারে সরকারি জোট এগিয়ে থাকায় নির্বাচনের ফল অনেকটাই অনুমেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবু ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দুই প্রার্থি মুখোমুখি হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিএনপির প্রার্থি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও আওয়ামী লীগের বদরুদ্দোজা হায়দার চৌধুরী। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থি পান ১৭২ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থি পান ৯২ ভোট। ৮০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন ছিল দেশের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এরপর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। এবারের নির্বাচনের ফলও অনেকটা নির্ধারিত। তারপর জনগণের আগ্রহ বাড়ছে এই নির্বাচন ঘিরে।
আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ব্রিফিংয়ে ইসি সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থীই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। ফলে নির্ধারিত সূচিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট শেষ হওয়ার পর বৈধ ও বাতিল ব্যালট গণনা করে সংসদ কক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্মকর্তা।
ইসি সচিব জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তাঁদের জন্য সমসংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত কিছু ব্যালটও সংরক্ষণ করা থাকবে। ভোটের দিন ব্যালট পেপারের রং হবে সাদার ওপর কালো প্রিন্ট। ভোটের আগে ডাকযোগে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ব্যালট পাঠানোর সুযোগ থাকছে না। নির্বাচন সহায়ক কর্মকর্তা ও নির্ধারিত স্বেচ্ছাসেবকেরা সরাসরি ব্যালট পেপার সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে নিয়ে গিয়ে সংসদ সদস্যদের হাতে তুলে দেবেন। এ কাজে প্রায় ২০ জন কর্মকর্তার একটি দল দায়িত্ব পালন করবে।
আখতার আহমেদ বলেন, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এরপর বিজয়ী প্রার্থীর নাম গেজেট আকারে প্রকাশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
দেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থি থাকায় ভোটাভুটির প্রয়োজন পড়েনি। ফলে সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘটনা দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম দুই প্রার্থি রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন। এ কারণেই এবারের নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ। যদিও সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচনটি নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থি এবং বিরোধী জোটের প্রার্থি মুখোমুখি হওয়ায় এবারের ভোটকে অনেকেই প্রতীকী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবেও দেখছেন। সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে ফেরার ঘটনাও। এ কারণে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব নিয়ে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে।
আ.দৈ/আরএস




















