দুর্নীতির আখঁড়া ডিএনসিসি, প্রশাসক নিরব
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মাহবুবের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর,সুবিধাভোগী, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও শত শত কোটি টাকা লোপাটকারী সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্যরা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) গুরুত্বপূর্ণ পদে। আর এই সুবাধে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ‘জনগণের ট্যাক্স ও সরকারের অর্থায়নে’ পরিচালিত সেবামূলক এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসিকে ভয়াবহ দুর্নীতির আখঁড়ায় পরিনত করেছেন। ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিলটনের আমলেও পুরনো সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য মতে, ডিএনসিসির লোপাটের সিন্ডিকেটর সদস্যদের মধ্যে অন্যতম হলেন, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম ও তার সহযোগিরা। ডিএনসিসির সাবেক মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের আমলে নগরীতে উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের সহায়তাকারী বলে খ্যাত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের সাথে সাথে তৎকালীন মেয়র মো.আতিকুল ইসলামও পালিয়ে যায়। কিন্তু রেখে যায় আতিকের দোসর ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলমসহ একাধিক প্রভাবশালী প্রকৌশলী এবং বেশ কয়জন বিভাগীয় প্রধানকে।
এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া আরেক লোপাটকারী ও দুর্নীতিবাজ প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আমলে আগের সিন্ডিকেটে নতুন কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও আমলারা যুক্ত হয়। পুনগঠিত এই সিন্ডিকেট ফ্রি স্টাইলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন।
এরপর গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যক আসনে বিজয়ী হবার পর জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হয়। এই সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডিএনসিসিকে দুর্নীতি ও লোপাট মুক্ত প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিলটনকে প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর শফিকুল ইসলাম খান দুর্নীতিবাজদের পুরনো সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবেপরিচিত বড় বড় ঠিকাদারকে প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ দিচ্ছেন।
শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর পালিয়ে যাওয়া একাধিক ঠিকাদারকে শত শত কোটি টাকার কাজ দিচ্ছনে। অপরদিকে বিএনপি নেতা/কর্মীদের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানর আজো কোন কাজ পাচ্ছন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে আরো অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান প্রশাসকের অত্যন্ত ঘনিষ্ট কর্মকর্তা ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
এরমধ্যে বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকীর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও দুই সিটি করপোরেশনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাকে বলা হয় ডিএনসিসির ভাগ্যবান কর্মকর্তা। তিন সরকারের তিনজন মেয়র ও প্রশাসকের আনুকল্য পেয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা হওয়া একাধিক অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে আরো জানান, প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো থেকে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। প্রশাসনের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিএনসিসির ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টো। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুবের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রকল্পের কাজ বিতর্কিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের মধ্যে বিলি বণ্টন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নানা প্রশ্ন থাকলেও তিনি এখনো রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) পদে পদোন্নতি পান। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ ডিএনসিসিতে মাহবুবকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়।
আরো জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবদুল হাই স্বাক্ষরিত একটি আদেশে খন্দকার মাহবুব আলমকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের জন্য ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। এই কর্মসূচিতে কয়েক কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। ওই সময় তিনি প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।২০২৪ সালের ৯ মে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের যোগসাজসে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বেশ কয়েকটি দোকান, গাড়ি এবং একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটসহ অনেক সম্পদের অভিযোগ উঠেছে।
আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ডিআরএসপি প্রকল্পের প্রায় ৮২২ কোটি টাকার কাজের মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয় আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার মাহবুব আলমের সাথে একাধিক গনমাধ্যম কর্মীরা যোগাযোগ করলে তিনি পরিস্কার জবাব দেন। তিনি সরকারি চাকরি করেন। ফলে দায়িত্বে যে মেয়র বা প্রশাসক এসেছে তার সাথে কাজ করেন। এটা তার দায়িত্ব। ফলে তার সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ কেউ অপপ্রচার করছে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করা ও বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীর ফোকাল পয়েন্ট থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। তার দাবি ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।
আ.দৈ/আরএস




















