রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অদম্য কণ্ঠস্বর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম  আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ৫:৩৬ পিএম  (ভিজিট : ৪৮)
X

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি তিন দফায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন, কারাবরণ, নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলে পরিপূর্ণ। বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর ধীরে ধীরে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর দৃঢ় ও আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমর্থকদের কাছে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

ঘর থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। সেই সংকটময় সময়েই গৃহবধূ খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ।

১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

তখন সামরিক শাসনের অধীনে দেশ। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণের পর খালেদা জিয়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজপথে এরশাদবিরোধী আন্দোলন
১৯৮০-এর দশকে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। সভা-সমাবেশ, হরতাল, ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার গৃহবন্দী হতে হয়।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে।

অবশেষে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদের পতনের পর দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার নতুন পথ তৈরি হয়।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পায়। এরপর বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর নেতৃত্বে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৯১ সালের সরকার আমলে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর সরকারের অন্যতম আলোচিত পদক্ষেপ।

ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি সরকারের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। রাজনৈতিক চাপের মুখে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৯৬ সালের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব নেন।

এরপর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়ী হলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকার পরিচালনা করেন।

ওয়ান-ইলেভেন ও রাজনৈতিক সংকট
২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

ওই সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দী থাকেন। একই সময়ে তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও দেশের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়া আবার বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয় হন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি কারাবন্দী ও পরে গৃহবন্দী অবস্থায় ছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিল তাঁর দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক এবং ‘আপসহীন নেত্রী’। 

শেষ অধ্যায়
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রভাব রেখে গেছেন, তা তাঁর সমর্থক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

গৃহবধূ থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন, রাজপথের আন্দোলনের নেত্রী থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী—বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন বহন করছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম, তাঁর নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যতেও ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।সূত্র বাসস

আ.দৈ/এসআর



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝