অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিকশায় বাড়ছে সড়ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশজুড়ে দ্রুত বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য ধীরগতির তিন চাকার যান। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যান চলাচল করায় একদিকে নগর ও আঞ্চলিক সড়কে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে; অন্যদিকে ব্যাটারি চার্জে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে চাপ তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যানকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট রুট ও লেন নির্ধারণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে অনুমোদনহীনভাবে রিকশা তৈরি ও ব্যাটারি চার্জের অবৈধ সংযোগ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সঠিক সংখ্যা নিয়ে নেই ঐকমত্য
সারা দেশে ঠিক কত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলছে, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ধারণা, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই এ ধরনের যান রয়েছে প্রায় ২০ লাখ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীতে নিবন্ধিত প্যাডেল রিকশার সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি। এর বাইরে আরও বিপুলসংখ্যক রিকশা নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করছে। এসব প্যাডেল রিকশার একটি বড় অংশে পরে ব্যাটারি ও মোটর সংযোজন করে যান্ত্রিক রিকশায় রূপান্তর করা হচ্ছে।
সড়কে বাড়ছে বিশৃঙ্খলা
ব্যাটারিচালিত রিকশার বড় একটি সমস্যা হলো অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো, হঠাৎ ইউটার্ন নেওয়া, প্রধান সড়কে উঠে আসা এবং অন্যান্য যানবাহনের গতির সঙ্গে সমন্বয় না থাকায় যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকার বাইরে ইজিবাইকের পাশাপাশি বিভিন্ন শহর ও মফস্বল এলাকায় ব্যাটারিচালিত ভ্যানও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গণপরিবহনের সঙ্গে এসব ধীরগতির যান চলাচলের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের মান এবং ফিটনেস পরীক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
রাতের বিদ্যুৎ চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ
ব্যাটারি রিকশার বিস্তারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব যান ঠিক কত পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নেই। তবে বিপিডিবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাত ১২টার পর সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসার কথা থাকলেও প্রত্যাশিত হারে তা কমছে না।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, পিক আওয়ার শেষ হওয়ার পর বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট কমার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। এর পেছনে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের ব্যাটারি চার্জকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সিপিডির এক সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও পরিবর্তিত হচ্ছে।
সিপিডির হিসাবে, ই-থ্রি-হুইলারগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে, যা দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াটের সমপরিমাণ। ঢাকায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা ৩ হাজার ৩০০ হলেও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার।
সমস্যার উৎসে নজর দেওয়ার তাগিদ
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু রাস্তায় অভিযান চালিয়ে বা কিছু রিকশা জব্দ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি অবৈধভাবে রিকশা আমদানি, নির্মাণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের মতে, উৎসস্থলে এসব যান তৈরির নিয়ন্ত্রণ না করা হলে রাস্তায় অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাঁর মতে, ব্যাটারি রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইনি কাঠামো এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন নীতিমালা
ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ই-রিকশার নকশা, ধারণক্ষমতা, চলাচলের এলাকা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় চালকসহ নির্ধারিত আসনসংখ্যার ই-রিকশা চালু করা হবে। ঢাকায় ডিএমপির আটটি জোনে পৃথক রঙ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের মাধ্যমে ই-রিকশা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ ঠেকাতে জিপিএস ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে।
প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলাচল বন্ধ, লাইসেন্স ছাড়া উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ এবং নিবন্ধন ও ফিটনেসের আওতায় আনার বিষয়টিও নীতিমালায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার আইনের আলোকে ই-রিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়কে শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক লাইসেন্সিং ও নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হবে।
সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনাও
এদিকে ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র ব্যাটারি রিকশা তৈরির প্রবণতা বন্ধে নির্দিষ্ট কিছু কারখানাকে অনুমোদনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন শুধু যানজটের সমস্যা নয়; এটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত একটি বড় ইস্যু। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব যানকে রাতারাতি নিষিদ্ধ না করে নিবন্ধন, লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট, ফিটনেস, নিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে আনা হলে সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।
আ.দৈ/এসআর




















