ঢাকা দুই সিটিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা,ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
আবুল কাশেম:

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অতিমাত্রায় স্বজনপ্রীতি, সিনিয়রদের বঞ্চিত করে জুনিয়র ও পছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন দপ্তরে প্রাইজ পোস্টিং এবং অতিরিক্তি দায়িত্ব প্রদানের ঘটনা ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনে বেড়েছে। একই সাথে নানা অযুহাতে ও মিথ্যে অভিযোগে রাজনৈতিক ইস্যু সামনে টেনে অদৃশ্য কারণ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে হয়রানীমূলক বদলির ঘটনায় প্রচন্ড ক্ষোভ ও অসন্তোষ বেড়েছে ঢাকার দুই সিটিতেই। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনা কাটায় নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকা তসরুপের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ঢাকা দুই সিটির বেশ কয়জন কর্মকর্তা “আজকের দৈনিক” পত্রিকাকে বলেছেন,বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানী ঢাকাকে একটি সুন্দর,পরিচ্ছন্ন,বাসযোগ্য ‘ক্লিন ও গ্রীণ’ শহরে পরিনত করতে চান। একই সাথে ঢাকার দুই সিটিতেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকা লাপাট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্বেও কেনা কাটায় এবং উন্নয়ন ও সংস্কার মূলক প্রকল্পের নামে বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকার কাজে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লোপাট থামছে না। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন রয়েছে।
অপরদিকে প্রতিহিংসার কারণে ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটিতে একাধিক কর্মকর্তাকে দ্রুত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি, সাময়িক বরখাস্ত এবং ঢাকার বাইরে বদলির ঘটনা অনেক বেড়েছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটির তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী খায়রুল বাকের, যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো.আনিসুর রহমান ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। পরে মো.আনিসুর রহমানকে সচিবের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিনকে ঢাকার বাইরে বরিশাল সিটিতে বদলি করা হয়েছে।
এছাড়াও সুনিদিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়াই বেনামী ও জনৈক ব্যক্তির মৌখিক অভিযোগে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ছাত্রজীবন থেকে জড়িত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া রুবেলকে কথিত দুর্নীতি অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের কোন সত্যতা না পেয়ে মন্ত্রণালয় তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি তাকে চাকরিতে পুন:বহাল করেছে। কিন্তু গণমাধ্যমে তার বিষয়ে যে অসত্য ও মিথ্যে তথ্য প্রচারের ফলে তার অনেক সম্মানহানী হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসন তার কি ক্ষতিপূরণ দিবেন ? এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে।
অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটির সহকারী প্রকৌশলী মো.আলী হায়দারকে গত ৬ জুলই সুনিদিষ্ট কারণ ছাড়াই বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছে। এরআগে আগের সহকারী প্রকৌশলী মো.কামরুল হাসানকেও হুটকরে বরিশাল সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছিল। পরে অবশ্য মো.কামরুল হাসান আবার ঢাকায় আগের দপ্তরে ফিরে আসেন। এছাড়াও তথ্য কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার ববীকে ‘কালিয়াকৈর পৌরসভায়’ বদলি করা হয়। এখনো অনেকে হয়রানীমূলক বদলি আতঙ্কে আছেন।
কর্মকর্তারা আরো জানান, একই আইনে পরিচালিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রকৌশলীদের পদোন্নতিতে মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিধিমালায় গেজেটে মারাত্নক ত্রুটিপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। আর এই ত্রুটিপূর্ণ বিধি সংশোধন না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদেরকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে তড়িগড়ি করে পদোন্নতির উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু তাই নয়, এসব বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আপত্তি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়েরের পর রিটকারী কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বরিশাল সিটিতে বদলি করার অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তারা বলেন, পদোন্নতি পাবার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু এটা ত্রুটিপূর্ণ বিধি মালায় কেনো। বিধিমালা সংশোধন করে পদোন্নতি দিলে সবার জন্যই মঙ্গলজনক। সর্বশেষ খবরে জানা যায় এসব বিষয় নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। দুদকে এই বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে জানা যায়।
ঢাকা দুই সিটিতেই হয়রানী আরো অভিযোগ:
নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক কর্মকর্তা আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে একাধিক চক্র পরিকল্পিতভাবে কথিত গুরুত্বর অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রচার করেন। উত্থাপিত এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযোগ তদন্ত পূর্বক স্থানীয় সরকার বিভাগকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োজিত করা হয়।
আর ওইসব অভিযোগের বিভিন্ন কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে বদলি করা হচ্ছে। কিন্তু ওইসব সিটি কর্পোরেশনে বদলীকৃত কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকই সমমর্যাদার পদ পান না। ফলে তাদের যোগদান গ্রহণ করা হয় না এবং কর্মকর্তারা ভাসমান অবস্থায় ঘুরতে থাকে।
এদিকে ' মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নং ১(৪)/৯১-মপবি (সাধারণ)/১৬৩ (৩০০) ১৯৯৩ সালের ৫ আগস্ট ১৯৯৩/২১ প্রকাশিত পরিপত্রে পরিস্কার উল্লেখ করা হয়েছে। বেনামী অথবা নামবিহীন দরখাস্তের উপর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
তবে মন্ত্রণালয়ে কিন্তু ওই নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ায় সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বেনামী বা নামবিহীন বা ঠিকানাবিহীন দরখাস্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারীকে হয়রানী করা এবং প্রশাসনিক কর্মকান্ডে অহেতুক জটিলতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই এই সকল দরখাস্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই প্রেক্ষিতে পুনর্ব্যাক্ত করা যাচ্চ্ছে যে, বেনামী বা নামবিহীন বা ঠিকানাবিহীন দরখাস্তের উপর কোন প্রকার অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
ওই নিদেশনায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দরখাস্তে যদি সুনির্দিষ্ট বিষয়/ঘটনা, ঘটনার সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম প্রমাণ সম্বলিত কাগজাদি ইত্যাদির থাকে। তা হলে এই ধরণের অভিযোগ তদন্তযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। উপরোক্ত সিদ্ধান্ত সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও তাহাদের অধীনস্থ সরকারী, আধা-সরকালী, স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহে যথাযথভাবে পালন করিবার জন্য সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারী করতে অনুরোধ করা হয়।
আ. দৈ./কাশেম




















