রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাভারে একের পর এক প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার, নেপথ্যে কারা?
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৮ পিএম   (ভিজিট : ৮৬)
X

ঢাকার সাভারের সাদাপুর এলাকার মসজিদের মাঠে পাওয়া কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেশার কুকারটিকে শক্তিশালী বোমা হিসেবে শনাক্ত কওে নিষ্ক্রয় করে পুলিশ। বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। 

এতে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকা স্থানীয়দের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে থাকা ব্যবসায়ী নিবীর হোসেন বলেন, ‘এত শক্তিশালী বোমা, তা জানা ছিল না। যখন নিষ্ক্রিয় করা হয়, তখন বিকট শব্দে এলাকা কেঁপে ওঠে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।’ সাভার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিকট শব্দে এলাকা কেঁপে উঠেছে। এটা অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বোমা। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কমকর্তারা বিস্তারিত ব্রিফ করবেন।’

এদিকে ঢাকার সাভার-আশুলিয়ায় একের পর এক বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আশুলিয়ার পর এবার সাভারের সাধাপুরে একটি মসজিদের মাঠ থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকার উদ্ধারের পর সেটিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে এসবের নেপথ্যে কি একই কোনো চক্র কাজ করছে, নাকি বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এসব বিস্ফোরক রেখে যাচ্ছে?

এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র থাকার কথা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে একই ধরনের ডিভাইস অল্প সময়ের ব্যবধানে উদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ। তদন্তকারীরা এর উৎস, কারা এগুলো তৈরি বা বহন করছে এবং কী উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে রেখে যাচ্ছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন।

সর্বশেষ বুধবার সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্প এলাকার সাধাপুর গোপেরবাড়ি, লালটেক ঘোড়া মসজিদের মাঠে একটি নীল প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে কাপড়চোপড়, কোরআন শরিফ ও কালো স্কচটেপে মোড়ানো একটি প্রেসার কুকার দেখতে পান স্থানীয়রা। রাত দেড়টার দিকে ড্রামটি মাঠে রেখে তিন ব্যক্তি চলে যান বলে স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে পুলিশ। পরে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জায়গাটি ঘিরে ফেলে এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলকে খবর দেয়।

দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করে। দুপুর ৩টা ২৮ মিনিটে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের সময় বিকট শব্দ ও সাদা ধোঁয়া দেখা যায়। তবে উদ্ধার হওয়া বস্তুটির প্রকৃতি, এতে কী ধরনের বিস্ফোরক ছিল এবং এটি কে বা কারা সেখানে রেখেছে এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলেনি পুলিশ।

সাভারের ভবানীপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই ইমরান হোসেন বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারটি দেখতে পায়। প্রাথমিকভাবে এটিকে বোমা মনে হওয়ায় বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিটকে খবর দেয়া হয়। পরে ইউনিট এসে সেটি নিষ্ক্রিয় করে।

আশুলিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা॥ সাধাপুরের ঘটনার আগে গত ৩০ জুলাই আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকায় একটি মুদিদোকানের সামনে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে প্রেসার কুকার আকৃতির একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, মাস্ক পরা এক ব্যক্তি দোকানে কোমল পানীয় কিনতে এসে ব্যাগটি রেখে চলে যান। পরে ব্যাগের ভেতর স্কচটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকার দেখে সন্দেহ হয়।

 সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে এবং ব্যাগটি রেখে যাওয়া ব্যক্তিকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিলেন আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।

এ ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় আরও বড় ধরনের তথ্য সামনে আসে। গত মঙ্গলবার রাতে সিটিটিসি ও সাভার থানা-পুলিশের অভিযানে একজনকে আটকের পর তার কাছ থেকে বোমা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, সিটিটিসি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে ওই এলাকায় জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্যরা অবস্থান করছে এবং তাদের কাছে বিস্ফোরক রয়েছে। এরপর একজনকে আটক করা হয় এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তির কাছে থাকা ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি পাঁচটি পাইপবোমা উদ্ধার করা হয়। পরে বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষ থেকে একই ধরনের আরও বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। তবে সাধাপুরের প্রেসার কুকার উদ্ধারের সঙ্গে ওই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো পুলিশ প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি।

তাহলে নেপথ্যে কী?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে অন্তত তিনটি বিষয় সামনে আসে। প্রথমত, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক স্থানে বিস্ফোরক বা বোমাসদৃশ ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এসবের মধ্যে কিছু ডিভাইস বিশেষভাবে তৈরি এবং জনবহুল বা সাধারণ মানুষের চলাচলের কাছাকাছি স্থানে রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, দক্ষিণ শ্যামপুরের অভিযানে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের দাবি করায় ওই এলাকায় বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়েছে।

তবে এসব ঘটনাকে এক সূত্রে গাঁথার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বিশেষ করে সাধাপুরের ঘটনায় স্থানীয়রা তিন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ড্রাম রেখে যেতে দেখেছেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। ওই ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করা গেলে ডিভাইসটির উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।

পুলিশের তদন্তে এখন মূলত গুরুত্ব পাচ্ছে ডিভাইসগুলো কোথা থেকে এসেছে, কারা এগুলো তৈরি করেছে, এগুলো বহনের সঙ্গে কারা জড়িত এবং কেন মসজিদের মাঠ, দোকানের সামনে কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফেলে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে নতুন ঘটনার কোনো সাংগঠনিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আতঙ্ক ছড়ানোও কি উদ্দেশ্য?
বোমা সত্যিকারের হোক কিংবা বোমাসদৃশ কোনো বস্তু জনবহুল এলাকায় এ ধরনের বস্তু ফেলে রাখলে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হয়। সাধাপুরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ এলাকাটি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয় এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলকে ডেকে আনে।

ফলে এসব ঘটনায় শুধু বিস্ফোরণের আশঙ্কাই নয়, আতঙ্ক সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি কিংবা কোনো বড় ধরনের অপরাধের প্রস্তুতির সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তবে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।

পুলিশের নজরে পুরো সাভার-আশুলিয়া॥ একই এলাকায় পরপর এসব ঘটনার কারণে সাভার-আশুলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বাড়ছে। বিশেষ করে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, সিটিটিসি ও স্থানীয় থানা-পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিত্যক্ত ব্যাগ, ড্রাম, প্রেসার কুকার কিংবা সন্দেহজনক কোনো বস্তু দেখলে সাধারণ মানুষ যেন সেটি স্পর্শ না করেন। 

বরং নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে দ্রুত পুলিশকে খবর দেয়া উচিত। সর্বশেষ সাধাপুরের ঘটনায় কোনো হতাহত না হলেও অজ্ঞাত তিন ব্যক্তির রেখে যাওয়া ড্রাম থেকে প্রেসার কুকার উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। আর দক্ষিণ শ্যামপুরে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা এর সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তদন্তকারীদের হাতে এসব প্রশ্নের উত্তর এলে পরিষ্কার হবে—সাভার-আশুলিয়ায় সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে সক্রিয় কোনো চক্র রয়েছে। আপাতত পুলিশ বলছে, ঘটনাগুলোর যোগসূত্র ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই তদন্তের মূল লক্ষ্য।

আ.দৈ/আরএস




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝