জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রি যাচ্ছে বেসরকারি খাতে
প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হলে শক্তিশালী ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে
শাহীন রহমান

বাংলাদেশের জ্বালানি তেল খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে। সরকারের যুক্তি, এতে আমদানির উৎস বাড়বে, সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হবে এবং কোনো একটি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই উদ্যোগ থেকে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তারা বলেন দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। ফলে সরকারি একচাটিয়া কাঠামোর উপর নির্ভও করার সুযোগ নেই। তবে জ্বালানি খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দিলে সেটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মধ্যে করতে হবে। তাদের যুক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত দরকার, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারিকরণ নয়।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী সরকার। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে নয়, যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ তৈরি করতে একটি সাধারণ নীতিমালা করার কথা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর। পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, জাহাজ পরিবহন সমস্যা কিংবা আমদানির অর্থায়নে জটিলতা তৈরি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের একটি চিন্তা হলো শুধু সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দেয়া। এতে আমদানির পথ ও সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং কোনো একটি উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস থেকে তেল আনার সুযোগ তৈরি হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শুধু তেল আমদানি নয়, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রেও অংশ নিতে পারে। এর ফলে পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের পাশাপাশি অবস্থান তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো সরবরাহের নিরাপত্তা বৃদ্ধি। বর্তমানে বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো কারণে সরকারি আমদানি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একাধিক বেসরকারি আমদানিকারক থাকলে সেই ঝুঁকি কিছুটা ভাগ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। একাধিক প্রতিষ্ঠান একই বাজারে কাজ করলে তারা কম খরচে আমদানি, দ্রুত সরবরাহ ও ভালো সেবা দেয়ার চেষ্টা করবে। এর ফলে জ্বালানি খাতে দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃতীয়ত, সরকারের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত চাপ কমতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থায়ন ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা ব্যবহার করে আমদানি করলে পুরো চাপ সরকারের ওপর থাকবে না। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে নতুন স্টোরেজ, টার্মিনাল, পরিবহনব্যবস্থা ও বিতরণ অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব অবকাঠামো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো প্রতিযোগিতার নামে নতুন একচেটিয়া বাজার তৈরি হওয়া। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমদানির সুযোগ দেয়া হলেও যদি শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি হবে না। বরং রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবসা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
তারা বলছেন জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য, যার দাম ও সরবরাহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, কৃষির সেচ ব্যয় বাড়ে এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়ে। তাই জ্বালানি বাজারে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক ক্ষমতা তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ সরকারি একচেটিয়া কাঠামো ভাঙার পক্ষে মত দিয়ে বলেন সরকার এ বিষয়ে সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে; তাই পুরোনো সরকারি একচেটিয়া কাঠামোর ওপর নির্ভর করে থাকার সুযোগ নেই। জ্বালানি খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা প্রয়োজন। তবে বেসরকারি বিনিয়োগকে জনস্বার্থে রাখতে সরকারকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে। তার যুক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত দরকার, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারিকরণ নয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে বেসরকারিকরণের আরেকটি ঝুঁকি হলো মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট। কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যদি বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে চলে যায়, তাহলে সরবরাহ কমিয়ে বা মজুত করে বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সময় এ ধরনের ঝুঁকি আরও বেশি। এ কারণে শুধু আমদানির লাইসেন্স দেয়া যথেষ্ট নয়; সরকারকে কঠোর বাজার তদারকি, মজুতের সীমা, বাধ্যতামূলক মজুত এবং সংকটকালে সরবরাহ নিশ্চিত করার নিয়মও করতে হবে।
তাদেও মতে, বেসরকারি খাতে আমদানি চালু হলে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হতে পারে জ্বালানি তেলের দাম কমবে কি না। এখানে বিষয়টি সরল নয়। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে আমদানির খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়তে পারে। তবে খুচরা তেলের দাম শুধু আমদানির দামের ওপর নির্ভর করে না। আন্তর্জাতিক বাজারের দাম, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর, মজুত ও বিতরণ ব্যয়সহ সরকারের মূল্য নির্ধারণ নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বেসরকারি আমদানি চালু করলেই পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সরকারের উচিত হবে একটি স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তার সুফল দ্রুত পৌঁছায় এবং দাম বাড়লে বাড়তির পরিমাণও যুক্তিসংগত থাকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম তুলনামূলকভাবে বেসরকারি অংশগ্রহণের পক্ষে বলেন রেগুলেশনই হচ্ছে মূল ব্যাপার। তিনি মনে করেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দিলে সেটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মধ্যে করতে হবে। আমদানিকারকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো ও অন্যান্য বিষয়ে শর্ত থাকা প্রয়োজন। তিনি ভারতের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি জ্বালানি বিক্রি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও বিপিসির ভূমিকা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ জ্বালানি তেল কৌশলগত পণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিপিসি ভবিষ্যতে সরাসরি সব তেল আমদানির একমাত্র প্রতিষ্ঠান না হয়ে কৌশলগত মজুত, বাজার তদারকি, সংকট ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি খাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি উন্মুক্ত করা হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, কোনো একটি কোম্পানি যেন বাজারের অস্বাভাবিক বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য বাজার-শেয়ার সীমা ও প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক আমদানিকারককে নির্দিষ্ট পরিমাণ জরুরি মজুত রাখতে বাধ্য করতে হবে। সংকটের সময় সরকার যাতে সেই মজুত ব্যবহার বা বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তার আইনি ব্যবস্থা থাকা দরকার। তৃতীয়ত, আমদানি মূল্য, পরিবহন ব্যয়, কর এবং খুচরা মূল্যের কাঠামোতে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এতে অতিরিক্ত মুনাফা বা মূল্য কারসাজির সুযোগ কমবে। চতুর্থত, মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উৎস থেকে তেল আমদানি করলে জ্বালানির মান নিশ্চিত করার জন্য কঠোর পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একদিকে এটি সরবরাহের বিকল্প উৎস বাড়াতে, প্রতিযোগিতা তৈরি করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ আনতে এবং সরকারের ওপর আমদানির চাপ কমাতে পারে। অন্যদিকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাজারে একচেটিয়া ক্ষমতা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই মূল প্রশ্ন বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেয়া হবে কি না শুধু সেটি নয়; বরং কোন শর্তে, কতটি প্রতিষ্ঠানকে এবং কী ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সুযোগ দেওয়া হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার যদি প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৌশলগত মজুত, মূল্য স্বচ্ছতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সংকটকালে সরবরাহের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এই সংস্কার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে একই উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার পরিবর্তে বেসরকারি একচেটিয়া বাজার তৈরি করতে পারে। ফলে সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, সারা পৃথিবীতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করে। ভারতের সরকারি ইন্ডিয়ান অয়েল ও বেসরকারি রিলায়েন্সের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির সুযোগ দেয়ার নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। তবে এটি এখনও যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
আ.দৈ/আরএস




















