অবশেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গড়াচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
শাহীন রহমান

বিএনপির প্রার্থী হচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ
অলি আহমদকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুলকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ফখরুলের নাম প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। অপর দিকে এ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন পরে এই নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গড়াচ্ছে।
ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনকে সামনে রেখে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ধীরে ধীরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকেই এগোচ্ছে।
জানা গেছে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ফখরুলের নাম চূড়ান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি। দলের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ক্ষমতা চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এদিকে রোববারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষে রুহুল কবীর রিজভী ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি ফরম দুটি সংগ্রহ করেন। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একজন প্রার্থীর জন্যই ফরম নেয়া হয়েছে; ভুলত্রুটি এড়াতে দুটি ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির নামে এখনো মনোনয়নপত্র নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে একই দিনে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বৈঠক করে ১১ দলীয় জোট অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জোটটির অবস্থানও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার হলো।
অলি আহমদকে সামনে রেখে ১১ দলের অবস্থান॥ রোববার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠকের পর এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে তারা শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছে না; বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, জুলাই সনদ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করে দেখছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে সব পক্ষের ঐকমত্যে একজন গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দেয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়নি বলে ১১ দল আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা কী হবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অলি আহমদকে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরাসরি জামায়াতের কোনো নেতাকে সামনে না এনে জোটের শরিক এলডিপির চেয়ারম্যানকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। এতে জোটটি রাষ্ট্রপতি পদে একজন জোটগত ও তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতার প্রার্থী তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ৬ আগস্ট ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফরম সংগ্রহ করলেও বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত হয়েছে বলে দলীয় সুত্রে জানান গেছে। এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকাও প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার ৩৪৯ জন। জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে একটি আসন শূন্য থাকায় ভোটারের সংখ্যা ৩৪৯। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে দলগুলোর আসনসংখ্যাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান সংসদীয় হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ও তাদের সমর্থিতদের হাতে ২১২টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সংখ্যা ৭৭। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে ৩৪৯ ভোটারের মধ্যে অন্তত ১৭৫ ভোট পেলেই একজন প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন। সে হিসাবে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর অবস্থান সংখ্যাগতভাবে বেশ শক্তিশালী। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সংখ্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতাও গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন। আর একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই ধারায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন মূল নজর বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী এবং মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিকে।
এরপরই স্পষ্ট হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে কি না। হিসাব অনুযায়ি অলি আহমদ প্রার্থী হলেও তাঁর জয়ের জন্য বিএনপির বাইরে ব্যাপক সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এর মাধ্যমে বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংখ্যার বিচারে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে অলি আহমদের প্রার্থিতা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয়বারের মতো বিরোধী প্রার্থী॥ ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবারও বিরোধী পক্ষের একজন প্রার্থী দেয়ার ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল। তিনি বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হন। সেই দিক থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতা রাজনৈতিকভাবে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ বিএনপির বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যেও ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে যাচ্ছে।
জুলাই সনদ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন॥ এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে। ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য কোথায় থাকবে—এ প্রশ্নগুলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণার পর নাহিদ ইসলামও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে একটি সর্বসম্মত ফর্মুলার সুযোগ ছিল; কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ১১ দল আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। এখানেই বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক দূরত্বটি স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে বিএনপি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে ১১ দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে রাষ্ট্রসংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করছে।
সামনে তিন দিনই গুরুত্বপূর্ণ॥ ইসির তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা হবে এবং ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির প্রার্থী হলে, একদিকে থাকবে দীর্ঘদিনের বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী; অন্যদিকে থাকবেন মুক্তিযুদ্ধের বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদ। দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়, অভিজ্ঞতা ও অবস্থানও তখন নির্বাচনের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
নাম ঘোষণা করায় আপাতত দুই পক্ষের প্রার্থিতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু কে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক সম্পর্ক, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, ভবিষ্যৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন।
আ.দৈ/আরএস




















