অনেক আগের বরাদ্দ প্রাপ্ত বৈধ দোকান নিয়মিত ভাড়া পরিশোধের পরও উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র, যত্রতত্র অবৈধ দোকানের ছড়াছড়ি
বিনা নোটিশে দোকান বরাদ্দ বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টে রিট,ডিএনসিসির প্রতি রুল জারি
আবুল কাশেম

ছবিতে- টার্মিনালে দুই শতাধিক অবৈধ দোকানের কিছু চিত্র
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মিরপুর গাবতলী আন্ত:জেলা ও নগর বাস টার্মিনালে প্রশাসক মো.শফিকুল ইসলাম খান মিলটনের নাম ভাঙ্গিয়ে স্থানীয় বাগবাড়ির একাধিক ব্যক্তি জোরপূর্বক নিরীহ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাাঁদাবাজিসহ এক ভীতিকর পরিস্থিতি সুষ্টির অভিযোগ উঠেছে। টার্মিনালে চিহ্নিত ওই ব্যক্তিরা পতীত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই দলের পরিচয় ব্যবহার করতো। বর্তমানে বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করেন। তারা প্রশাসকের নাম ভাঙ্গিয়ে অত্যন্ত দাপটের সাথে টামির্নালের ভেতরে এবং ফুটপাতে ইচ্ছা মতো দোকান বসিয়ে চাাঁদবাজি করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ ওই এলাকাবাসী এবং ব্যবসায়ীদের।
এদিকে আরো অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে বৈধভাবে দোকান বরাদ্দ নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রায় ২৫/২৮ বছর যাবৎ এই টার্মিনালে সরকারি নিয়ম মেনে শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা করে আসচ্ছেন এমন ব্যবসায়ীরাও আজ হয়রানীর শিকার। আরো অনেকেই ২৫ বছর যাবৎ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরাদ্দ নিযে নিয়মিত বাড়া পরিশোধ করে ব্যবসা করে আসেছে, এবার তাদের চোখে হতাশার গ্লানি এবং হয়রানী ভিতি কাজ করছে।
কিন্তু হঠাৎ স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্রটি কৌশলে জোরপূর্বক একের পর এক ব্যবসায়ীকে বৈধ দোকান থেকে উচ্ছেদের টার্গেট করেছেন। তবে ওই চক্রটিকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও গাবতলী বাস টার্মিনালের দায়িত্ব থাকা জনৈক কর্মকর্তা।
সূত্র মতে, প্রায় ১৯৯৫ সাল থেকে এই টার্মিনালে বৈধভাবে দোকান বরাদ্দ নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত মাসিক ভাড়া নিয়মিত পরিশোধ করে ব্যবসা করে আসছেন মিরপুর বাগবাড়ি এলাকার -স্মৃতিময় রাজবংশী- নামে এক ব্যক্তি ও তার লোকজন। বর্তমানে টার্মিনালে ১৪ নম্বর দোকানটিতে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার পক্ষ থেকে গত জুন মাসেও নির্ধারিত ভাড়া ডিএনসিসিকে পরিশোধ করা হয়েছে।
কিন্তু পূর্ব নোটিশ ছাড়াই গত ২৮ জুলাই টার্মিনালের ১৪ নং দোকানের বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই আইনানুগভাবে বরাদ্দকৃত -স্মৃতিময় রাজবংশীকে -দোকান থেকে উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন ডিএনসিসি। এই -১৪ নম্বর দোকানটি অন্যজনকে বরাদ্দ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিএনসিসির বিরুদ্ধে।
এদিকে নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ী -স্মৃতিময় রাজবংশীর- পক্ষ থেকে গত ০২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন নং ১০৫০৭/২০২৬ মামলা দায়ের করা হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ রিট মামলাটি শুনানি গ্রহণ করেন এবং ডিএনসিসির পরিবহন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ শওকত ওসমান সহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি 'রুল নিশি' জারি করেছেন। একই সাথে উক্ত আদালত গত ২৮ জুলাই মিরপুর বাস টার্মিনালের ১৪ নং দোকান বরাদ্দ বাতিল সংক্রান্ত চিঠির কার্যকারিতা ০৩ মাসের জন্য 'স্থিতাবস্থা' (status-quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাহিদ সুলতানা জেনি বাদীর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন। রিটে ডিএনসিসির পরিবহন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ শওকত ওসমানের স্বাক্ষরিত চিঠির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, বেআইনিভাবে এবং পরিবহন মহাব্যবস্থাপকের স্বেচ্ছাচারী প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে বাদীর পক্ষে রিট মামলাটি শুনানিকালে অনেক তথ্য উপস্থাপন করা হয়। শুনানিকালে টানা ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে বৈধভাবে বরাদ্দ পাওয়া দোকানের অফিসিয়াল চিঠিসহ তথ্য উপস্থাপন করা হয় বলে জানা যায়।
এরমধ্যে কয়েকটি তথ্য আজকের দৈনিক পত্রিকার এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো, ২০০৯ সালে ১৬ জুলাই অভিভক্ত সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মিরপুর আন্ত:জেলা গাবতলী বাস টার্মিনালের ম্যানাজার মো.শহীদুর রহমান ব্যবসায়ী- স্মৃতিময় রাজবংশীর- নামে মাসিক ১০ হাজার ৩৮০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে ৬৯২ বর্গ ফুটের একটি দোকান বরাদ্দ দেন।
আরো উল্লেখ করা হয়, ঢাকা সিটি করপোরশেন ভিভক্ত হবার পর গত ২০১৪ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ডিএনসিসির গাবতলী বাস টার্মিনারলের সহকারী ম্যানেজার মো. দেলোয়ার হোসেন টার্মিনালের ভেতর ৬৯২ বর্গফুটের ১৪ নম্বর দোকানটি ব্যবসায়ী - স্মৃতিময় রাজবংশীর -নামে মাসিক ১৭ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে বরাদ্দ দেন । এবং ৬ মাসের ভাড়ার টাকা ১ লাখ ৩ হাজার ৮০০ টাকা জামানত হিসেবে জমা দিতে বলা হয়। নির্ধারিত এই টাকা চালানের মাধ্যমে ডিএনসিসির ফান্ডে জমা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির বর্তমান মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শওকত ওসমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে গাবতলী বাস টার্মিনালের ভেতরে বৈধভাবে বরাদ্দ দেওয়া অনেক দোকানের মাসিক ভাড়া পুন: নির্ধারণ করেন চিঠি ইস্যু করেন।
তিনি টার্মিনালের আলোচিত ১৪ নম্বর দোকান টি ব্যবসায়ী -স্মৃতিময় রাজবংশীর -নামে মাসিক ২৬ হাজার ৯৮৮ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করেন। এরপর থেকে ওই দোকানের মাসিক ভাড়া নিয়মিত পরিশোধ করে স্মৃতিময় রাজবংশী- লোকজন । এমনকি সর্বশেষ গত জুন ২০২৬ পর্যন্ত মাসিক ২৬ হাজার ৯৮৮ টাকা ভাড়া পরিশোধ করেছেন। এরপর হঠাৎ কোন কারণ দশানো ছাড়াই গত ২৮ জুলাই ডিএনসিসির জিএম মোহাম্মদ শওকত ওসমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ব্যবসায়ী -স্মৃতিময় রাজবংশীর ১৪ নম্বর দোকানটির বরাদ্দ বাতিলের চিঠি পাঠান। শুধু তাইনয়, অপর একজনকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বরাদ্দ দেওয়া পায়রা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাবতী টার্মিনালের একাধিক ব্যবসায়ী পরিচয় গোপন রেখে আজকের দৈনিক পত্রিকাকে জানান, ডিএনসিসির মিরপুর গাবতলীর এই আধুনিক নক্শা ও ডিজাইনে নির্মিত আন্ত:জেলা ও নগর বাস টার্মিনালটি ধীরে ধীরে স্থানীয় কতিপয় চাঁদাবাজ এবং অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ব অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। পুরো বাস টার্মিনালে ছোট বড় মিলে অবৈধভাবে প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ দোকান পাট বসিয়ে মোটা অংকের চাঁদাবাজি চলছে। তাদের কারণে বিএনপি সরকার এবং বর্তমান প্রশাসকের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
তারা আরো জানান, ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং পরিবহন বিভাগ ও গাবতলী বাস টার্মিনালের ম্যানাজারের সহযোগিতায় স্থানীয় বিএনপির বহিস্কৃত একাধিক নেতা ও কমী এই বাস টার্মিনালে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তারা গাবতলী বাস টার্মিনালে বর্তমান প্রশাসকের নাম ভাঙ্গিয়ে নিরীহ ব্যবসায়ী এবং আন্ত:জেলা বাস কাউন্টারের মালিকদের নানা ভাবে হয়রানী করছে। ইচ্ছা মাফিক নকশার বাইরে যেখানে সেখানে দোকান বরাদ্দ, দোকান বসানো এবং বাসের কাউন্টার বানিয়ে মোটা অংকের চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। আরো অভিযোগ আছে বাস টার্মিনালে ঢুকতেই সুন্দর পার্কটি আজ নোংরা করে ফেলেছে।
পার্কটির চারদিকে অবৈধভাবে হকারদের দোকান বসিয়ে টার্মিনালের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে,টার্মিনালের ভেতরে ও বাইরে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার আর নেই। আগের সুন্দর পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই। মনে হচ্ছে ডিএনসিসির কতিপয় কর্মকর্তা আজ অবৈধভাবে চাঁদার টাকার ভাভাভাগি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। তবে জরুরি ভিত্তিতে টার্মিনালের চাঁদাবাজদের দমন এবং অবৈধ দোকান উচ্ছেদের অভিযান প্রয়োজন।
আ. দৈ./কাশেম




















