আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
শাহীন রহমান

আজ ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের এই দিনে টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান । এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
দেশ এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি পায়। দিনটির দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হচ্ছে। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন, দোয়া ও প্রার্থনা, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরতে নানা আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও পৃথক কর্মসূচি পালন করছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা দ্রুত সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
সেদিন কারফিউ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হন। শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। দুপুরের দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি দেশ ত্যাগ করেন।
সরকার পতনের খবরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ উল্লাস প্রকাশ করে। অনেকেই গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করেন। রাজপথে বিজয় মিছিল, আনন্দ-উল্লাস এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্?যাপন করা হয়।
তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল ব্যাপক প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে হতাহতের সংখ্যা ভিন্ন হলেও, জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে আন্দোলন চলাকালে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা বিভিন্ন মামলায়ও বহু হতাহতের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর জুলাই-আগস্টের ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলায় রায়ও ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই-আগস্টের ঘটনায় নিহত ও আহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিচারাধীন মামলাগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তির আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে। তবে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সেটি সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে এর পরিসমাপ্তি ঘটে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং সুশাসন নিয়ে যে বিতর্ক চলছিল, আন্দোলনের সময় সেগুলো আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। আবার আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের দাবি ছিল, আন্দোলনের একটি পর্যায়ে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে এবং সাংবিধানিক সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়েও এখনো রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
দুই বছর পরও জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব রেখে চলেছে। আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এখনো বিচার ও ক্ষতিপূরণের প্রত্যাশা করছেন। আহতদের অনেকেই চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবিও জানিয়ে আসছেন।
আজকের দিবসটি তাই একদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্মারক, অন্যদিকে আন্দোলনে প্রাণ হারানো মানুষের স্মরণে শোক ও শ্রদ্ধা জানানোর দিন। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে শহীদদের স্মরণ, গণআন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মূল্যায়ন, এর প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনে এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইতিহাসের এই অধ্যায় দেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর্মসূচী
‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ বুধবার সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বেলা ১২টায় জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এমপি।
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ১ মিনিটে শাহবাগস্থ জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেবেন।
দিবসটি উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনসমূহেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। এছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সামরিক জাদুঘর, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরসহ সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রসমূহ শিশুদের জন্য দিনব্যাপী উন্মুক্ত রাখা হবে। সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু পরিবার ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে।
একইসাথে, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি ভবন ও স্মৃতিস্তম্ভ জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।
আ.দৈ/আরএস




















