মতামত নেবে শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের
জুলাই সনদকে ভিত্তি করে সংবিধান পর্যালোচনায় বিশেষ কমিটি
নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি ধরে দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। এ লক্ষ্যে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি, শহীদ পরিবারের সদস্য, আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে কমিটির কাজের পদ্ধতি, আলোচনার পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়গুলো নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকের শুরুতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণিও সাংবাদিকদের কাছে কমিটির সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুধু কমিটির সদস্যদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে না। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ করে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, “আমরা সবার কথা শুনব। যেখানে যেখানে সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে, সেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।”
কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও জুলাই যোদ্ধাদের মতামত নেওয়া হবে। পাশাপাশি সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে কোনো দলের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় রাখা হবে।
তিনি বলেন, “যেসব বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি, সেগুলো গ্রহণ করা হবে। আর যেসব বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো ভিন্নমত হিসেবেই থাকবে।”স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়েই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে শুধু জুলাই সনদের নির্দিষ্ট প্রস্তাব বিবেচনা করলেই হবে না, বরং পুরো সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার বিষয়টিও দেখতে হবে। তিনি বলেন, “পুরো সংবিধান পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে। কারণ একটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে আরেকটি অনুচ্ছেদের সামঞ্জস্য থাকতে হবে।”
আইনমন্ত্রী জানান, জুলাই সনদের বক্তব্য হুবহু সংবিধানে যুক্ত করা হবে না। বরং সনদের মূল বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো সাংবিধানিক ভাষায় রূপান্তর করা হবে। তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্বও সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় রাখা হবে। কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষ সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে কোনো পরিবর্তন চাপিয়ে দিতে পারবে না।
আইনমন্ত্রী ভারতের কেশবানন্দ ভারতী মামলা এবং বাংলাদেশের অষ্টম সংশোধনী মামলার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে মৌলিক কাঠামোর সীমারেখা মানতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নিলেও তাদের মতামত গ্রহণ করা হবে। তারা লিখিতভাবে প্রস্তাব দিলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণিসহ জাতীয় সংসদের কয়েকজন সদস্য। কমিটির দায়িত্ব হলো সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়া। তবে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, এই সংবিধান সংশোধন শুধু বর্তমান সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই করা হচ্ছে। সময়ের পরিবর্তন ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
তবে কমিটি গঠনের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তাদের দাবি, সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ার পরিবর্তে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন করা উচিত।
সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ এখন বিভিন্ন পক্ষের মতামত সংগ্রহ ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জনসম্পৃক্ততার ওপরই এ প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
আ.দৈ/আরএস




















