সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন
মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনা, বাড়তে পারে আকার
শাহীন রহমান

সরকারের ছয় মাস পূর্তিকে সামনে রেখে মন্ত্রিসভায় সীমিত পরিসরে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। আগামী ১৫ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও কয়েকজন মন্ত্রীর সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্র দলগুলোর নেতাদের পাশাপাশি বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, তরুণ সংসদ সদস্য ও নারী প্রতিনিধিদেরও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। সূত্র বলছে, তিন থেকে চারজন নতুন সদস্য মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন।
তবে আপাতত কোনো মন্ত্রীকে বাদ দেয়ার সম্ভাবনা কম। পরিবর্তন হলে তা মূলত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বা পোর্টফোলিও পুনর্বণ্টনের মধ্যেই সীমিত থাকতে পারে। কারণ কাউকে বাদ দিলে তার বিরুদ্ধে অযোগ্যতা বা ব্যর্থতার ধারণা তৈরি হতে পারে বলে সরকার দায়িত্ব পরিবর্তনের পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমান ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। কয়েকজন মন্ত্রীর হাতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, সংসদীয় কার্যক্রম ও রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেছেন, সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে।
সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রী বড় ধরনের সাফল্যের নজির তৈরি করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের কথা বলে আসছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর শৃঙ্খলা ও ব্যয় সাশ্রয়ের নীতির সঙ্গে কয়েকজন মন্ত্রীর আচরণের পার্থক্য নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রটোকল কমানো, ট্রাফিক সুবিধা না নেয়া এবং অফিসে সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখলেও কিছু মন্ত্রী তা অনুসরণে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মসূচির অগ্রগতি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পদায়ন নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের কথা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন মূলত নতুন সদস্য যুক্ত করা ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক আলোচনার ওপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমান মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের ছয় মাসের মূল্যায়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, জনসেবা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং রাজনৈতিক কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব মূল্যায়নের আলোকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে আলোচনা রয়েছে।
সরকারি দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বড় ধরনের রদবদলের পরিবর্তে কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই সীমিত পরিসরে পরিবর্তনের পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষ করে যেসব মন্ত্রীর অধীনে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে, সেসব দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমানে অর্থ ও পরিকল্পনা, শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা, কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদ, সড়ক পরিবহন-রেল-নৌপরিবহন, ডাক ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে একজন মন্ত্রীর অধীনে একাধিক দপ্তর রয়েছে। প্রশাসনের একটি অংশের মতে, এত বড় দায়িত্ব একজন ব্যক্তির পক্ষে সমান দক্ষতায় পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কাজের গতি বাড়াতে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
জানা গেছে মন্ত্রিসভার আকারও কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। নতুন কয়েকজন সদস্যকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সম্ভাব্য সদস্যসংখ্যা কিংবা কারা যুক্ত হতে পারেন, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এর মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, সেলিমা রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বরকত উল্লাহ বুলু ও জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব নামের কোনোটি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
সূত্রগুলো আরও বলছে, যেসব মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব অথবা সমন্বয় সংকটের অভিযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেশি। কিছু মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিবর্তে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পথও বেছে নেয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের মেয়াদের শুরুতেই কর্মসম্পাদনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এতে একদিকে মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তাদেও মতে, সরকারের জনপ্রত্যাশা পূরণ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং জনসেবা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই এমন মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি কোনো মন্ত্রীর কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ না দিয়ে তার দায়িত্ব পরিবর্তন করে অন্য কাউকে সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে পারেন।
আ.দৈ/আরএস




















