রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুই দশক পর আবার উদ্যোগ
গ্যাস সংকটে ফের আলোচনায় মিয়ানমার পাইপলাইন
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ৫৫)
X

এলএনজির বিকল্প খুঁজছে সরকার, 
তবে রাজনৈতিক ঝুঁকি ও বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

দেশে ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি, শিল্পে জ্বালানি সংকট এবং ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির চাপের মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির পুরোনো প্রস্তাব। প্রায় দুই দশক আগে নানা কারণে বাস্তবায়ন না হওয়া এ উদ্যোগ নতুন করে বিবেচনায় আনছে সরকার।

  রোববার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোয়ের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তাই মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশ আগ্রহী। জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আকারেও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা প্রকল্প অনুমোদন হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের সন্ধান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেই সংকটের সমাধান হবে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কয়েক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার কারণে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানিকে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিয়ানমারের সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাইপলাইন স্থাপনের কারিগরি, আর্থিক ও কূটনৈতিক সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। 

জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগ আবারও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। জানা গেছে ওই সময় মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছিল। সে সময় গ্যাসের মূল্য, ট্রানজিট সুবিধা এবং রাজনৈতিক সমঝোতাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরে মিয়ানমারের গ্যাস চীন ও থাইল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। দেশে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি ধীর এবং শিল্পায়নের ফলে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সরকার আমদানি উৎস বৈচিত্র্যময় করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি। 

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির বহু অঞ্চলে সংঘাত চলছে। সম্ভাব্য পাইপলাইনের রুট নিরাপদ থাকবে কি না, অবকাঠামো রক্ষা করা সম্ভব হবে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না এসব প্রশ্নের এখনো সন্তোষজনক উত্তর নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, পাইপলাইনের গ্যাস অর্থনৈতিকভাবে এলএনজির তুলনায় সুবিধাজনক হতে পারে। তবে শুধু দামের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। সরবরাহের নিশ্চয়তা, উৎস দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্ত সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশকে বহুমুখী জ্বালানি কৌশল অনুসরণ করতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির পাশাপাশি দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তার মতে, দেশীয় সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে না লাগিয়ে কেবল আমদানিনির্ভর কৌশল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। কারণ পাইপলাইন নির্মাণে কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া গ্যাসের মূল্য, অর্থায়ন, পাইপলাইনের মালিকানা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি মতো বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে সুস্পষ্ট সমঝোতা জরুরি। 

তারা বলছেন মিয়ানমারের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় বাস্তবতা। ফলে জ্বালানি সহযোগিতা এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। 

কারণ পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি শুরু হলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে দেশের সংকট দূর করবে না। কারণ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা, অর্থায়ন, পরিবেশগত মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নির্মাণ সব মিলিয়ে বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং নতুন অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে তিনটি সমান্তরাল কাজ রয়েছে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা। এর সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশও ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির ধারণাটি এখনো নীতিগত আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনাও চূড়ান্ত নয়। তবে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সরকার সম্ভাব্য সব বিকল্পই খোলা রাখতে চায়। 

যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। কিন্তু সেটি দেশের জ্বালানি সংকটের একমাত্র সমাধান নয়; বরং এটি হতে পারে একটি বৃহত্তর, বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের অংশ।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝