আইসিডিডিআর’বির অনুসন্ধান
হামের ভাইরাসে জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ নেই
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু
বিশেষ প্রতিনিধি

দেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের কারণে প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে কি না এমন প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই ছিল। তবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি)-এর এক অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফল বলছে, বর্তমানে দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি, যা বিদ্যমান টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে সক্ষম।
গবেষকদের ভাষ্য, হাসপাতালে ভর্তি সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে যেসব শিশু জাতীয় কর্মসূচি অনুযায়ী দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকা পেয়েছিল, তাদের পরীক্ষায় হাম শনাক্তের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। একই সঙ্গে জিনোম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৫ হাজার ২৭২ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামজনিত বলে সন্দেহ করা ৭২১টি মৃত্যু এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইসিডিডিআর’বি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা গত ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ জন সন্দেহভাজন শিশুর ওপর অনুসন্ধান চালান। তাদের মধ্যে ৩২৪ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশু। এ বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের শরীরে হাম ভাইরাস শনাক্ত হয়।
গবেষণায় শিশুদের বয়স ও টিকা গ্রহণের অবস্থা অনুযায়ী চারটি দলে ভাগ করা হয়। নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স না হওয়া ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম নিশ্চিত হয়। আবার টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন এবং পূর্ণ দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের হাম নিশ্চিত হয়।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফল দেখে দুই ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ গবেষণায় শুধু সন্দেহভাজন হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি পুরো জনসংখ্যার টিকার কার্যকারিতা নির্দেশ করে না। বরং তথ্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, টিকা না পাওয়া শিশুদের তুলনায় দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার হার কম ছিল, যা টিকার সুরক্ষামূলক ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইসিডিডিআর’বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতার কারণে মানুষের মধ্যে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে তাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; এ জন্য আরও বৃহৎ গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণায় পূর্ণ টিকা নেওয়ার পরও কয়েকজন শিশুর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন গবেষকেরা। তাদের মতে, কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা ব্যক্তিভেদে শারীরিক পার্থক্য এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
তবে বর্তমান গবেষণায় এসব কারণ বিশ্লেষণ করা হয়নি। ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য জানতে গবেষকেরা ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআর’বি এবং ৩৭টি নমুনা আইইডিসিআর সিকোয়েন্স করে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবগুলোই বি৩ সাবক্লেডের অন্তর্ভুক্ত এবং আন্তর্জাতিকভাবে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। ভাইরাসের এইচ প্রোটিনে চারটি মিউটেশন শনাক্ত হলেও গবেষকেরা বলছেন, এগুলো নতুন নয় এবং এ কারণে প্রচলিত টিকা অকার্যকর হয়ে গেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
গবেষণাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এনেছে। বাংলাদেশে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। ফলে প্রথম ডোজের আগ পর্যন্ত শিশু মূলত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমাজে বিদ্যমান সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল থাকে। আইসিডিডিআর’বির আগের একটি ছোট গবেষণার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাত্রা দ্রুত কমে যায় এবং তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। গবেষকেরা বলছেন, বড় পরিসরে এই বিষয়টি আরও যাচাই করা দরকার।
আইসিডিডিআর’বির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে টিকার বিকল্প নেই। তবে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার পরও কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিল, সেটিও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে গবেষকেরা মনে করছেন, কোথাও কোথাও টিকাদানের ঘাটতি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে আইসিডিডিআর’বি ইতোমধ্যে চারটি বিভাগীয় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল কোহর্ট গবেষণা শুরু করেছে। পাশাপাশি জিনোমিক নজরদারি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, জিঙ্ক ব্যবহারের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং শিশুদের টিকাদান থেকে বাদ পড়ার কারণ অনুসন্ধানেও নতুন গবেষণা শুরু হয়েছে।
গবেষকদের আহ্বান, অভিভাবকদের কোনো অবস্থাতেই হাম-রুবেলা টিকা নিতে দেরি করা বা টিকা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সব ডোজ সময়মতো নিশ্চিত করা এবং প্রাদুর্ভাব চলাকালে সরকারের টিকাদানসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করাই শিশুদের সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আ.দৈ/আরএস




















