রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের একচাটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার ক্রমেই কমছে
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৩ পিএম  আপডেট: ০১.০৮.২০২৬ ৮:৩০ পিএম  (ভিজিট : ৫২)
X

মাতৃদুগ্ধ নবজাতক ও শিশুর জন্য সর্বোত্তম এবং নিরাপদ খাদ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো, প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং দুই বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধ পান চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করে। 

তবে দেশে মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমছে। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের একচাটিয়ে দুগ্ধপানে হার ৫২ শতাংশ। সম্প্রতি কিছু গবেষণা উদ্বেগজনক এই তথ্য উঠে এসেছে।

ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ শিশু একচেটিয়াভাবে মাতৃদুগ্ধ পান করে। যদিও অতীতের তুলনায় মাতৃদুগ্ধ পানের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে, তবুও পূর্ববর্তী জরিপের তুলনায় এ হার কিছুটা কমেছে, যা নীতিনির্ধারক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক মা জন্মের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালেও ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন কারণে শিশুকে অন্য খাদ্য বা ফর্মুলা দুধ দিতে শুরু করেন। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৬৬ ভাগ। চার বছরের মধ্যে কমছে ১৪ ভাগ।

শনিবার থেকে আগামী ৭ আগস্ট শুক্রবার দেশে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে। এ উপলক্ষে শনিবার রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬’- এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, শিশুদের সুস্বাস্থ্যের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই।

 জন্মের পর প্রথম ৪-৫ মাস একটি শিশুর বৃদ্ধির মূল উৎসই মায়ের দুধ। জন্মেও পরই শিশুর প্রোটিনের সর্বোচ্চ ভাণ্ডার এই মাতৃদুগ্ধ। তিনি বলেন, পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক মা নিজের অপুষ্টির দোহাই দিয়ে শিশুকে দুধ দেয়া বন্ধ রাখেন, যা একেবারেই অনুচিত। অল্প বয়সে বিয়ে, অসচেতনতা এবং শিশুকে দুধ না দেয়ার কারণেই পুষ্টিহীনতা বাড়ছে।

মাতৃদুগ্ধ পানের উপকারিতা
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, মাতৃদুগ্ধ পান শিশু মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ কমায়। বিভিন্ন গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কান ও বুকের ইনফেকশন, কোষ্ঠকাঠিন্য, একজিমা, অ্যালার্জি এবং পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ওবেসিটি (অতিরিক্ত ওজন) ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা মাতৃদুগ্ধ না পানকারী শিশুর তুলনায় অনেক কম। 

তাছাড়া মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর বুদ্ধির বিকাশও সঠিক হয়। একই সঙ্গে মায়ের ক্ষেত্রেও মাতৃদুগ্ধ পান করানো প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ কমাতে, স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে এবং মা-শিশুর মানসিক বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়তা করে। তাই এটি শুধু একটি পুষ্টিগত বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কার্যকর কৌশল।

ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) গবেষণার সাথে জড়িত ড. ফারিয়া রহমান বলেন, বাংলাদেশে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার এখনও সন্তোষজনক নয়। নারীর ক্ষমতায়ন, নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এবং প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটলে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। 

ড. মো. জামাল হোসেন গবেষণায় ২০০৭-২০১৮-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখিয়েছেন মাতৃদুগ্ধ পানের প্রবণতা উন্নত হলেও কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার তুলনামূলকভাবে কম। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্ববান্ধব নীতি ও সহায়ক পরিবেশ না থাকলে এই হার আরও কমতে পারে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে মাতৃদুগ্ধ পানের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক নানা বিষয় প্রভাব ফেলে। মায়ের শিক্ষার স্তর, কর্মসংস্থান, পরিবারের আর্থিক অবস্থা, প্রসবের স্থান, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

গকেষণার ২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব মা সন্তান জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ান, তাঁদের মধ্যে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও ক্ষমতায়নও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মাতৃদুগ্ধ পানের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ফর্মুলা দুধের ব্যাপক প্রচারণা ও বিপণন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে অনেক মা গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর ফর্মুলা দুধের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হন, যা একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া কর্মজীবী মায়েদের পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি ও কর্মস্থলে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। গ্রামীণ এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে কুসংস্কার, ভুল ধারণা এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাবের কারণেও মাতৃদুগ্ধ পানের সঠিক চর্চা ব্যাহত হয়।

নোয়াখালী জেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ মায়ের মাতৃদুগ্ধ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুকে অন্য খাবার দিতে শুরু করেন। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে মায়ের জ্ঞান, ইতিবাচক মনোভাব, স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ এবং পারিবারিক সমর্থন একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে কর্মজীবী মা, কম শিক্ষিত মা এবং পর্যাপ্ত পরামর্শ না পাওয়া মায়েদের মধ্যে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার তুলনামূলকভাবে কম।

করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে মাতৃদুগ্ধ পানের হার আরও বৃদ্ধি করতে হলে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সময়ে প্রতিটি মাকে মাতৃদুগ্ধ বিষয়ে সঠিক পরামর্শ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মজীবী মায়েদের জন্য পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মস্থলে স্তন্যদানবান্ধব পরিবেশ এবং শিশু পরিচর্যা সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি। তৃতীয়ত, ফর্মুলা দুধের অনিয়ন্ত্রিত প্রচারণা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ডঐঙ-এর আন্তর্জাতিক নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার এখনও কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় নারীর ক্ষমতায়ন, জন্মের প্রথম ঘণ্টায় স্তন্যদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক সহায়তার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ফর্মুলা দুধের আগ্রাসী বিপণন, কর্মজীবী মায়েদের সীমাবদ্ধতা এবং সচেতনতার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পানের হার আরও উন্নত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

আ.দৈ/আরএস




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝