একাধিক ফ্রন্টে একের পর এক দেশ সংঘাতে জড়াচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধের বিস্তার
শাহীন রহমান

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ‘অতর্কিত হামলা চেষ্টার প্রতিশোধ হিসেবে’ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ‘ব্যাপক’ হামলা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে হামলা স্থগিতের পাঁচ দিনের মাথায় আবারও ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনারা।
এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, গত মঙ্গলবার জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে ইরানি বাহিনী যে হামলা চালিয়েছে, তার একটি “শক্তিশালী জবাব” হিসেবেই বৃহস্পতিবার তাদের ওপর পুনরায় আক্রমণ শুরু হয়েছে।
এই নতুন হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের তৎপরতা, ইয়েমেনে হুতিদের হুমকি এবং লোহিত সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এখন আর কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হচ্ছে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইরাক, ইয়েমেন, জর্ডান, মিশর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতের প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর বহুমুখী যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সংঘাতের মূল কেন্দ্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উভয় পক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর ফলে শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রপথ এবং বাণিজ্যিক জাহাজও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। এমনি ইঙ্গিত দিচ্ছে আল জাজিরা, এপি ও গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সব মিডিয়া।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরাকে ইরান-ঘনিষ্ঠ শিয়া মিলিশিয়াদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি সরকার দাবি করেছে, এসব হামলা আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সৌদি ভূখণ্ড বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে কঠোর জবাব দেয়া হবে। এই অবস্থান সৌদি আরবকে সংঘাতের আরও সক্রিয় অংশীদারে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাক বর্তমানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছে। দেশটির সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি ইরান-সমর্থিত জনপ্রিয় শিয়া মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব মিলিশিয়া ঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইরাক সরকার এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। একই সময়ে সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠিন ভারসাম্যের মুখোমুখি হয়েছে।
অপরদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন আবারও লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়েছে। তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুমকি জোরদার করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ঘোষণা দিয়েছে। হুতিদের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে হুতিদের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরের কাছে দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ দায় স্বীকার করেনি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই হামলা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত বহন করে। মিশর সরাসরি যুদ্ধে না থাকলেও তার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনাও ঘটেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অক্ষ গড়ে উঠেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরব এবং কয়েকটি আঞ্চলিক মিত্র নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইরাকের কয়েকটি শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের। এসব গোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে সমর্থন করছে। তবে ইরাকের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাত বিস্তার চায় না এবং নিজেদের ভূখণ্ডকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন রুট। এসব পথ ঝুঁকির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিভিন্ন দেশ বিকল্প রুট ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলা অব্যাহত থাকে এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আরও বড় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে সংঘাত লেবানন, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তবে এখনো বিভিন্ন দেশ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট একটি বহুমাত্রিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
এখানে শুধু রাষ্ট্র নয়, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরবের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়াদের পাল্টা হামলা, হুতিদের সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি এবং মিশরে ড্রোন হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে সংঘাত আর একক ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নেই। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে কূটনৈতিক সমাধান না এলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও গভীর অস্থিতিশীলতার মুখে পড়তে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















