সংখ্যা বাড়লে এখনো টিকে থাকার লড়াইয়ে সুন্দরবনের বাঘ
শাহীন রহমান

জরিপে সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতি পাওয়া গেছে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। তবে সংখ্যা বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট ও আবাসস্থল হারানোর ঝুঁকিতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভের রাজা
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। সর্বশেষ সরকারি ক্যামেরা-ট্র্যাপ জরিপে বাংলাদেশ অংশে ১২৫টি বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে, যা আগের জরিপের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যার এই ঊর্ধ্বগতি স্বস্তির হলেও সুন্দরবনের বাঘ এখনো নিরাপদ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, শিকার প্রাণীর সংকট, বনভূমির পরিবর্তন এবং মানুষ-বাঘ সংঘাত সব মিলিয়ে সুন্দরবনের বাঘ এখনো টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ের মধ্যেই রয়েছে।
গত ২০২৪ সালে সালে বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘের পাশাপাশি ২১টি বাঘশাবকের ছবিও ধরা পড়েছে। যদিও শাবকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে তাদের চূড়ান্ত গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গবেষকদের মতে, শাবকের উপস্থিতি প্রজনন অব্যাহত থাকার ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তাদের বড় হয়ে টিকে থাকার হার এখনো উদ্বেগজনক।
জরিপ ফল প্রকাশের সময় অন্তবর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসাস। সে সময় তিনি জানান, সুন্দরবনে বর্তমানে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২.৬৪টি বাঘ রয়েছে এবং মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫। তিনি এটিকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল হিসেবে উল্লেখ করলেও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বন সংরক্ষণ এবং শিকার প্রাণী রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে চোরাশিকার দমন, বন টহল বৃদ্ধি, আধুনিক ক্যামেরা-ট্র্যাপ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি জোরদারের কারণে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ধারা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যকে স্থায়ী ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর সবচেয়ে বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্রে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও ক্রমেই বাড়ছে। এতে বাঘের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। বনাঞ্চলের কিছু অংশে মিঠা পানির উৎস কমে যাওয়ায় শিকার প্রাণীর সংখ্যাও প্রভাবিত হচ্ছে।
বাঘ সংরক্ষণ গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের বাঘের টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হলো পর্যাপ্ত শিকার প্রাণী নিশ্চিত করা। চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকর সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য। এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে গেলে বাঘ বাধ্য হয়ে বনসংলগ্ন লোকালয়ের দিকে চলে আসে। এতে মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বনসংলগ্ন এলাকায় বাঘ প্রবেশের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা গবেষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
২০২৩-২৪ সালের সুন্দরবন বাঘ জরিপের বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; প্রাণিবিদ্যা বিভারেগর অধ্যাপক এম এ আজিজ। তিনি বলেন, সুন্দরবনের পরিবেশ এখনো বাঘের প্রজননের জন্য অনুকূল। সাম্প্রতিক জরিপে শাবকের উপস্থিতি এবং পূর্ণবয়স্ক বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে সংরক্ষণ কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে শিকার প্রাণী সংরক্ষণ, বনভূমির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক গবেষকরাও সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করছেন। ভারতের সুন্দরবন অংশে সাম্প্রতিক ক্যামেরা-ট্র্যাপে একাধিক বাঘশাবকের ছবি ধরা পড়ায় আশার সঞ্চার হলেও গবেষকদের একটি অংশ বলছেন, সুন্দরবনের কিছু অঞ্চলে বাঘের ঘনত্ব ইতোমধ্যে ধারণক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পর্যাপ্ত আবাসস্থল ও খাদ্য নিশ্চিত না করা গেলে ভবিষ্যতে বাঘের মধ্যে এলাকা নিয়ে সংঘাত বাড়তে পারে। এতে শাবকের মৃত্যুহারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পুরো বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে হবে। কারণ সুন্দরবনের বাঘ একটি ‘ছাতাপ্রজাতি’ (আমব্রেলা স্পেসিস)। বাঘ টিকে থাকলে হরিণ, বন্য শূকর, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ এবং ম্যানগ্রোভ বন—সবকিছুর মধ্যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। ফলে বাঘ সংরক্ষণ মানেই পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ।
সরকার আগামী এক দশকে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা আরও ২৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এজন্য বন টহল জোরদার, চোরাশিকার দমন, আধুনিক প্রযুক্তিতে বাঘ পর্যবেক্ষণ, শিকার প্রাণী সংরক্ষণ, বনভূমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
সুন্দরবন টাইগার কনজারভেশন প্রজেক্টেও প্রকল্প পরিচালক ছিলেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ আবু নাসের মহসিন হোসাইন। জরিপ প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ সালের মূল্যায়নে বাঘের সংখ্যা ১২৫-এ পৌঁছানো সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। এই অগ্রগতির পেছনে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গবেষক, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম, কমিউনিটি পেট্রোল গ্রুপ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিকল্প নেই।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। সুন্দরবনকে ঘিরে শিল্পায়ন, দূষণ, নদীতে নাব্যতা সংকট, অবৈধ বনসম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ গবেষণা এবং সমন্বিত সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। কারণ সুন্দরবনের বাঘ কোনো এক দেশের সম্পদ নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপন্ন বন্যপ্রাণী।
তারা বলেন, সুন্দরবনের বাঘ এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে না থাকলেও তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু তা ধরে রাখতে হলে বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি, বৈজ্ঞানিক এবং কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই। অন্যথায় আজ যে সংখ্যা বৃদ্ধিকে সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই আবার হুমকির মুখে পড়তে পারে। সুন্দরবনের রাজাকে রক্ষা করতে হলে তাই শুধু বাঘ নয়, বাঁচাতে হবে পুরো সুন্দরবনকেই।
আ.দৈ/আরএস




















