রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী কে এই ডেভিড ইমন
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ৫৫)
X

চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে ধুমধুমপুর এলাকা থেকে ডেভিডকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। এলাকায় তার ছিল সাধারণ জীবনযাপন। কিন্তু শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রামে একের পর এক খুনে নাম জড়ায় তার।

 বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। দেশ ছেড়ে এখন বসবাস করছেন দুবাই। সেখান থেকেই ফোনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ফোন করে চাঁদাবাজি করছেন। তার কথামতো চাঁদা না দিলে ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে চলছে গুলি-হামলার ঘটনা।

পুর্লিশ জানিায় ভারত থেকে দেশে ঢোকেন চার দিন আগে। এরপর আবার ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে। পুলিশ কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। পুলিশের অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। 

এরই মধ্যে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইমন প্রায়ই আসা-যাওয়া করেন। আমাদের কাছে তথ্য আছে, তাঁর কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এসব বিষয়ের বিস্তারিত জানা যাবে।’ পুলিশ সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে সেখানে থাকতেন ইমন। 

এদিকে সাজ্জাদ আলীর আরেক সহযোগী মো. রায়হানকে ধরতেও গতকাল রাতে নোয়াখালীতে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, নোয়াখালীর সেনবাগ এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই বাড়ির দেয়াল টপকে রায়হান পালিয়ে যান। তাঁকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫ টি। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়া দুজনের একজন ইমন। অপরজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। 

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার অ্যাকসেস রোডে ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। 

এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। পরে র‌্যাব-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢোকে। দেশি অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। এ সময় তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায়। সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন এই চাঁদা দাবি করেন বলে মামলায় বলা হয়। 

পরে ফেসবুকে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে মোবাইল ফোনের এক প্রান্ত থেকে ইমন পরিচয় দিয়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তারা ছুরি ও কিরিচ নিয়ে হামলা করেন না। তাদের হামলার ধরন কেমন, তা পুরো চট্টগ্রামবাসী জানে। পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে কল করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীর কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

 চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনার দুই দিন পর, গত সোমবার দুপুরে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মরিয়ম হাইটস ভবনের ডিডিএনের কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়।  হামলাকারীরা অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাব, কাচের দরজাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 

এ সময় দুর্বৃত্তরা অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগটি নিয়ে যায়। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল বলে ওই দিনই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ জানায় চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় একটি সন্ত্রাসী চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে ঘিরে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান এবং সহযোগীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসে তার নাম।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ডেভিড ইমন দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি, সশস্ত্র হামলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগের পর পুলিশ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে।

এ অভিযানে কয়েকজন সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের জুনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডেভিড ইমনকে ঢাকার একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। তবে পরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানায়, ওই ব্যক্তি প্রকৃত ডেভিড ইমন নন এবং তার গ্রেপ্তারের খবর বিভ্রান্তিকর। পরবর্তীতে পুলিশ জানায়, প্রকৃত ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।

এরপর জুলাই মাসে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের ধারণা ছিল, ডেভিড ইমন ওই এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। কয়েক দিনব্যাপী অভিযানে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযানের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা এবং সহযোগীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের নেতৃত্বে পরিচালিত চক্রটি চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’ ঘনিষ্ঠ একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
 বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে। 
ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে। এছাড়া অস্ত্র আইনে মামলা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগও রয়েছে। যদিও প্রতিটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি, তাই এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই আইনি সত্য নির্ধারণ করবে। এর আগে পুলিশ তার দুই সহযোগীকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের দাবি, এই সহযোগীরা ডেভিড ইমনের হয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের অবস্থান ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

আ.দৈ/আরএস




Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝