রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ওজন বাড়িয়ে বাজারজাত
চিংড়িতে জেলি মিশ্রিত করার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে
শাহীন রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ৮:২৩ পিএম  আপডেট: ২৮.০৭.২০২৬ ৮:৪৯ পিএম  (ভিজিট : ৬২)
X

মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী কাঁচাবাজারে অভিযান চালিয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেলি ভরা ৪০ কেজি চিংড়ি জব্দ করে ধ্বংস করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে মুলত ব্যবসায়ীরা ওজন বাড়াতে চিংড়িতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই জেলি পুশ করে। শুধু মিরপুরের শাহ আলী বাজারের নয়। চিংড়িতে জেলি ভরার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। 

দেশের চিংড়ি শিল্পকে “সাদা সোনা” বলা হয়। প্রতিবছর এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। লাখো মানুষের জীবিকা এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিংড়ির শরীরে জেলি বা অজ্ঞাত রাসায়নিক পদার্থ ইনজেক্ট করে ওজন বাড়িয়ে বাজারজাত করার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের একের পর এক অভিযানে শত শত কেজি জেলি-ইনজেক্ট করা চিংড়ি জব্দ হচ্ছে, যা শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণাই নয়, জনস্বাস্থ্য ও দেশের রপ্তানি সুনামের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে ডিপো বা আড়ত পর্যায়ে সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির মাথা বা দেহে জেলি-জাতীয় পদার্থ প্রবেশ করানো হয়। এর উদ্দেশ্য হলো ওজন বাড়ানো এবং চিংড়িকে আরও বড় ও টাটকা দেখানো। এতে প্রতি কেজি চিংড়িতে অতিরিক্ত ১০০-২০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন যোগ হতে পারে, ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি লাভ করেন।

সাম্প্রতি সময়ে চিংড়িতে জেলি পুশ রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। চলতি বছর সাতক্ষীরায় ১৬৪ কেজি জেলি-ইনজেক্ট করা বাগদা চিংড়ি জব্দ করে বিজিবি। ২০২৫ সালে সাতক্ষীরায় ৯০০ কেজি চিংড়ি পরীক্ষা করে ৩০০ কেজিতে জেলি বা ক্ষতিকর ভেজাল পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জরিমানাও করা হয়। চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও নিয়মিত অভিযানে জেলি-ইনজেক্ট করা চিংড়ি জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। 

অভিযানগুলোই প্রমাণ করে চিংড়িতে জেলি পুশের সমস্যা এখনও ব্যাপক। খোজ নিয়ে জানা গেছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের বহু ডিপোতে লাভের আশায় এখনও জেলি ইনজেকশন এখন নিয়মিত বিষয়। মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ৯৪টি অভিযান পরিচালনা করে, ২ জাজার ৭৫৫ কেজি ভেজাল চিংড়ি ধ্বংস করে এবং জরিমানা আদায় করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন সবচেয়ে বড় সমস্যা চিংড়িতে কী ধরনের জেলি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয় না। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও নির্ভর করে ব্যবহৃত পদার্থের ওপর। এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ইনজেকশন দেয়ায় ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কোনো বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় “জেলি-ইনজেক্ট করা চিংড়ি”র নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়নি। তাই কোন রাসায়নিক ঠিক কতটা ক্ষতিকর সে বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

গবেষণা কী বলছে?
বাংলাদেশে চিংড়ি নিয়ে হওয়া অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক এবং চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ওপর কেন্দ্রীভূত। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়িতে ভারী ধাতুর মাত্রা মূল্যায়ন করে দেখা যায়, পরীক্ষিত নমুনাগুলো সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য নিরাপদ সীমার মধ্যে ছিল। তবে এই গবেষণা জেলি ইনজেকশন নিয়ে নয়। অন্যদিকে ২০২১ ও ২০২৬ সালের গবেষণায় চিংড়ি চাষে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে ”শ্রিম্প ডিপোটস: কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিসেস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচেস ইন বাংলাদেশ। শিরোনোমে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।  এতে বলা হয় বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পে জেলি বা অন্যান্য বিদেশি পদার্থ ইনজেক্ট করে ওজন বাড়ানোর ঘটনা নতুন নয়; এটি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি পরিচিত সমস্যা। গবেষণাটি পাইকগাছা, দাকোপ ও চকরিয়ার ৫৭টি চিংড়ি ডিপোতে সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

গবেষক এস. এম. নজমুল আলম বলেন, চিংড়ি ডিপোগুলোতে গুণগত মান যাচাই এখনও মূলত চোখে দেখা ও হাতে স্পর্শ করার মতো প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ‘পুশ’ (জেলি বা বিদেশি পদার্থ ইনজেক্ট করা চিংড়ি), কাঠ বা ধাতব কণার মতো ভেজাল শনাক্তে সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে। বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থায় ৯০-৯৫ শতাংশ চিংড়ি বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ডিপোতে পৌঁছায়। 

এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল পণ্যের গুণগত মান, ট্রেসেবিলিটি এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে কঠিন করে তোলে। তিনি বলেন, চিংড়ি শিল্পকে টেকসই রাখতে ডিপোগুলোতে মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি, ট্রেসেবিলিটি (উৎস শনাক্তকরণ) এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার উন্নতি জরুরি। 

এ জন্য সরকার, ডিপো মালিক ও চাষিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি ক্রেতারা পরীক্ষায় ভেজাল ধরা পড়লে চালান ফিরিয়ে দেন বা কম দামে গ্রহণ করেন। একটি চালান বাতিল হলে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজারে সুনামও ক্ষুণ্ন হয়। 

এ অবস্থায় ডিপো ও আড়ত পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো। জেলি বা ইনজেক্ট করা পদার্থের রাসায়নিক বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করা। ভোক্তাদের জন্য দ্রুত শনাক্তকরণ পদ্ধতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা। রপ্তানির আগে মান নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জেলি মিশ্রিত চিংড়ি কেবল একটি খাদ্য ভেজালের ঘটনা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতের জন্য গুরুতর হুমকি। যদিও এ বিষয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন, তবুও ধারাবাহিক অভিযান, জব্দের ঘটনা এবং বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে যে সমস্যাটি বাস্তব এবং তা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বিএফএসএ উপপরিচালক বি এম রুহুল আমিন রিমন বলেন, সরকারের অন্যান্য দপ্তরের সমন্বয়ে প্রতিমাসে একবার করে এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। জনস্বার্থে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝