শেষ হলো দুমাসব্যাপি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস উৎসব
প্রতিভা অন্বেষণের নতুন প্ল্যাটফর্মে সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদরা
শাহীন রহমান

তৃণমূলের মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায়ের মঞ্চে প্রতিভা খুঁজে বের করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-এর প্রথম আসরের পর্দা নামল উৎসবমুখর পরিবেশে। সমাপনী দিনে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী| সোমবার রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা ক্ষুদে ও তরুণ ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণে ˆতরি হয় এক অনন্য আবহ| ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ, স্কুল পর্যায়ের খেলাধুলাকে উৎসাহ দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জাতীয় খেলোয়াড় ˆতরির লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয় এই বৃহৎ ক্রীড়া কর্মসূচি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, নিয়মিত এমন আয়োজনের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ ˆতরি হবে।
দীর্ঘ বিরতির পর শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতার জয়ীদের হাতে এদিন পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী| এর আগে তিনি বিকাল ৪টায় বালিকাদের ফাইনাল খেলা মাঠের পাশে বসে দেখেন| এতে রংপুরের কিশোরী ফুটবলাররা রাজশাহীকে ৪-০ গোলে পরাজিত করে শিরোপা লাভ করে| আর এদিন বালকদের ফুটবলে দারুণ লড়াইয়ের পর ময়মনসিংহ অঞ্চলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছে সিলেট অঞ্চল।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা যদি আগামী দিনে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারো সঠিকভাবে- তাহলেই আমরা বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে গড়ে তুলতে পারবো। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই যে গ্যালারিতে হাজার হাজার ছোট বন্ধুরা তোমরা বসে আছো তোমাদের মধ্যে থেকেই এই দেশের একজন ভালো ডাক্তার বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশের একজন ভালো আর্কিটেক্ট বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশের একজন ভালো ইঞ্জিনিয়ার বের হবে, তোমাদের ভেতর থেকে এই দেশে একজন ভালো ক্রিকেটার বের হবে, ভালো সুইমার বের হবে, ভালো টেনিস খেলোয়াড় বের হবে।
” সংবাদমাধ্যমের প্রতি শিশু-কিশোরদের এ খেলার সংবাদকে প্রধান শিরোনাম হিসেবে প্রকাশের অনুরোধ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকে যে প্রতিযোগিতাটা আপনারা দেখে গেলেন এই প্রতিযোগিতা হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়: নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মূল দর্শন ছিল শহরের সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকা শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনা।
এ জন্য প্রতিযোগিতাটি কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়| প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে বাছাই, এরপর উপজেলা, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাছাই হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেয় প্রায় ১ হাজার ৭০০ ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তা। ১০টি অঞ্চল থেকে আসা এসব তরুণ খেলোয়াড় ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, সাঁতারসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করে। জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই প্রথমবারের মতো বড় কোনো প্রতিযোগিতার মঞ্চে ওঠার সুযোগ পেয়েছে| প্রত্যন্ত এলাকার এসব খেলোয়াড়ের জন্য এটি ছিল নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি বড় সুযোগ।
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য: নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিশু-কিশোরদের মধ্যে ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো এবং খেলাধুলাকে ভবিষ্যৎ পেশা হিসেবে দেখার সুযোগ ˆতরি করা| আয়োজকদের প্রতিপাদ্য ছিল—“ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা”। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিভার অভাব নেই, তবে সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবে অনেক প্রতিভা হারিয়ে যায়।
তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে জাতীয় দলগুলোতে নতুন খেলোয়াড়ের সরবরাহ বাড়বে| ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিভা শনাক্ত করার পর তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং মানসম্মত কোচিং নিশ্চিত করাও জরুরি| তাহলে এই ধরনের আয়োজন থেকে পাওয়া প্রতিভাগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করতে পারবে।
সমাপনীতে নতুন প্রজন্মের উৎসব: সমাপনী অনুষ্ঠানে বালক ও বালিকাদের ফুটবল এবং ১০০ মিটার স্প্রিন্টসহ বিভিন্ন ইভেন্টের বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়| প্রধানমন্ত্রী বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে তাদের উৎসাহিত করেন| অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস ও ভবিষ্যতের ¯^প্ন| অনেকেই জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের এই অভিজ্ঞতা তাদের আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। একজন প্রত্যন্ত এলাকার কিশোর খেলোয়াড়ের ভাষায়, “এর আগে বড় কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি| এখানে এসে বুঝেছি, চেষ্টা করলে আমরাও বড় পর্যায়ে যেতে পারি।
ভবিষ্যতের ক্রীড়া সম্ভাবনা: বাংলাদেশে ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলায় সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড় রয়েছে| কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিভা খোঁজার কার্যক্রমের ঘাটতি ছিল| নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সেই ঘাটতি পূরণের একটি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের আয়োজন যদি নিয়মিত হয় এবং নির্বাচিত খেলোয়াড়দের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যায়, তাহলে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। তাদের মতে, একটি দেশের ক্রীড়ার উন্নয়ন শুধু বড় শহরের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রত্যন্ত এলাকার মাঠে বেড়ে ওঠা প্রতিভাবান শিশুদের সুযোগ দেওয়ার ওপরও নির্ভর করে| নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সেই সুযোগ ˆতরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অর্জনের মূল্যায়ন: প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশু-কিশোরদের একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর মাধ্যমে নতুন প্রতিভা শনাক্ত করার পাশাপাশি ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর সুযোগ ˆতরি হয়েছে| তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী দিনে নির্বাচিত খেলোয়াড়দের কীভাবে গড়ে তোলা হয় তার ওপর| নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
তৃণমূলের ছোট ছোট মাঠ থেকে উঠে আসা এই নতুন প্রজন্মই হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করবে—এই প্রত্যাশাতেই শেষ হলো নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসর।
আ.দৈ/আরএস




















