বর্ষায়ও বায়ু দূষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না রাজধানীবাসী
শাহীন রহমান

বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সংকট কাটেনি, বাতাসে সাময়িক উন্নতি হলেও বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় রাজধানী; শুষ্ক মৌসুমে ফের বাড়তে পারে ঝুঁকি
বর্ষার বৃষ্টিতে ঢাকার আকাশে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর বায়ুমান ‘মডারেট’ বা মাঝারি পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি স্থায়ী উন্নতির লক্ষণ নয়। বরং মৌসুমি বৃষ্টির কারণে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধুলিকণা ও দূষিত কণা ধুয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে বায়ুমান উন্নত হয়েছে। দূষণের মূল উৎসগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে না আনলে শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই ঢাকা আবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর কাতারে চলে যেতে পারে।
সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ৮০-৯০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে “মডারেট” হিসেবে বিবেচিত। তবে এই অবস্থায়ও ঢাকার স্থান বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ১৫ থেকে ২৬-এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রাজধানীর বাতাস এখনো স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং হাঁপানি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি রয়ে গেছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুন মাসে একাধিক দিনে ঢাকার অছও ১৬০ থেকে ১৮০-এর বেশি পৌঁছায় এবং শহরটি বিশ্বের শীর্ষ ১০ দূষিত নগরের তালিকায় উঠে আসে। সে সময় বাতাসকে “অস্বাস্থ্যকর” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নগর ব্যবস্থাপনার সংকটের ফল। রাজধানী ও আশপাশের ইটভাটা, নির্মাণকাজের উন্মুক্ত ধুলা, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো—এসবই দূষণের প্রধান উৎস। বর্ষায় বৃষ্টির কারণে দূষণের মাত্রা কমলেও এসব উৎস অপরিবর্তিত থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষকদের মতে, বর্ষাকালে প্রকৃতি নিজেই বাতাস পরিষ্কারের কাজ করে। বৃষ্টির পানি বাতাসে ভাসমান পিএম২.৫ ও পিএম ১০ কণার একটি বড় অংশ মাটিতে নামিয়ে আনে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে যখন বৃষ্টি থাকে না, তখন একই দূষণ আবার বাতাসে জমতে শুরু করে। ফলে সাময়িক উন্নতিকে স্থায়ী সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে সবচেয়ে আগে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে ইটভাটা। আধুনিক প্রযুক্তির বাইরে পরিচালিত ইটভাটাগুলো এখনও রাজধানীর বাতাসে বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম কণা ছড়ায়। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা এবং আইন বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিএম ২.৫ নামের অতিক্ষুদ্র কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহেও পৌঁছাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি হাঁপানি, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে সূক্ষ্ম বস্তুকণাকে নগর স্বাস্থ্যঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, কেবল অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ইটভাটা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানী ও আশপাশে সমন্বিত বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। গণপরিবহন উন্নত করা, পুরোনো যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার, খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ এবং নগরে সবুজায়ন বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য অপসারণ ও উন্মুক্ত স্থানে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পরিবেশবিদদের মতে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার এই সাময়িক স্বস্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি এখনই দূষণের মূল উৎসগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় কয়েক মাস পরই ঢাকার আকাশ আবার ধোঁয়া, ধুলা ও বিষাক্ত বস্তুকণায় ঢেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর লাখো মানুষের কাছে তাই প্রশ্ন একটাই—প্রতি বর্ষায় কি কেবল বৃষ্টির ওপরই নির্ভর করবে ঢাকার নির্মল বাতাস, নাকি এবার দূষণের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
আ.দৈ/আরএস




















