চীনা বিনিয়োগে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা
শাহীন রহমান

আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চলে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়, এক লাখ কর্মসংস্থানের আশা; উৎপাদন, রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এর অবকাঠামো নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, আনোয়ারার এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। দীর্ঘদিনের বিলম্ব কাটিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হওয়ায় এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন গতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের লক্ষ্য রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠা, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে ইলেকট্রনিকস, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, রাসায়নিক এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনের সুযোগ থাকবে। এসব শিল্পে উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। যদিও প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসংস্থানের সংখ্যা নির্ভর করবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরেও নতুন বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে চীনা উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে।
সম্প্রতি সরকার চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা বিনিয়োগ সহায়তা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতেও বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের আশা, চীনা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তর করলে দেশের শিল্পায়ন আরও দ্রুত এগোবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, মহাসড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামোর সুবিধা কাজে লাগাতে পারলে আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এতে শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হবে। পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, দ্রুত কাস্টমস সেবা, দক্ষ মানবসম্পদ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তবেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়বে। অন্যথায় সম্ভাবনার পুরোটা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশ যদি পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে তৈরি পোশাকনির্ভর অর্থনীতির বাইরে বহুমুখী রপ্তানি খাত গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। সেই লক্ষ্য পূরণে আনোয়ারার চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
এখন নজর থাকবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং শিল্পকারখানাগুলোর কার্যক্রম কত দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারে তার ওপর। এসব পরিকল্পনা সফল হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















