রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার বাড়ছে আশঙ্কজনকহারে
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:০১ পিএম   (ভিজিট : ৮৯)
X

প্রতিদিন পানিতে ডুবে হারিয়ে যায় ৪০ শিশুর প্রাণ। বছরে মৃত্যু ১৪ হাজারের বেশি; বাড়ির পাশের পুকুরই সবচেয়ে বড় মৃত্যুফাঁদ, প্রতিরোধ সম্ভব হলেও নেই কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ

গত শুক্রবার একদিনেই পানিতে ডুবে চার শিশুসহ ৫ চজনের মৃত্যুও ঘটনা ঘটেছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের পাঁচ উপজেলা নিকলী, মিঠামইন, কটিয়াদী, ভৈরব ও করিমগঞ্জে পৃথক ঘটনায় এসব শিশুদের মৃত্যু হয়। এটা একদিনের পরিসংখ্যান। দেশে এখন চলছে বর্ষকাল। 

খাল বিল পুকুর ডোবায় পানিতে পরিপুর্ণ ফলে একটু অসাবধানতায় ঝড়ে যাচ্ছে শিশুদের মুল্যবান প্রাণ। পরিসংখ্যান বলছে এভাবে প্রায় প্রতিদিনই গড়ে   ৪০টিরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দুই শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে পুকুর, ডোবা, খাল কিংবা নদীর পানি। বছরে এ সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়ে যায়। অথচ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যুর বড় অংশই সহজ ও কম খরচের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

শিশুমৃত্যুর এই নীরব সংকটকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষকরা বহু বছর ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও বিষয়টি এখনো জাতীয় অগ্রাধিকার পায়নি। ফলে সংক্রামক রোগে শিশুমৃত্যু কমে এলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবেই রয়ে গেছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (এইচডব্লিউও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে মৃত্যু।

নীরব মহামারি
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ জনই শিশু। সংস্থাটি এই পরিস্থিতিকে “সাইলেন্ট এপিডেমিক” বা নীরব মহামারি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া বা হামের মতো রোগ নিয়ে যতটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায়নি। ফলে হাজার হাজার পরিবার প্রতি বছর অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়লেও এটি জাতীয় আলোচনায় খুব কমই আসে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ১ থেকে ৪ বছরের শিশু
গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এ সময় শিশুরা হাঁটতে ও দৌড়াতে শেখে, কিন্তু বিপদের ধারণা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন। সেই সুযোগে শিশু বাড়ির পাশের পুকুর বা ডোবায় চলে যায়। গবেষকদের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনা সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ঘটে, যখন পরিবারের প্রাপ্তবয়স্করা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন।

বাড়ির পাশের পুকুরই মৃত্যুফাঁদ
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই রয়েছে পুকুর বা জলাশয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ডুবে মৃত্যুর প্রায় ৪৩ শতাংশই পুকুরে ঘটে। অধিকাংশ ঘটনা বাড়ি থেকে মাত্র ২০ মিটারের মধ্যে থাকা জলাশয়ে ঘটে। অর্থাৎ শিশুরা দূরে কোথাও নয়, নিজেদের বাড়ির আশপাশেই প্রাণ হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ির চারপাশে বেড়াবিহীন পুকুর, অরক্ষিত জলাশয় এবং শিশুদের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এই মৃত্যুর প্রধান কারণ। শুক্রবার একদিনের যে কিশোরগঞ্জে যে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে তাদেও অধিকাংশ পুকুর হাওর ও বিলের পানিতে অন্য শিশুদেও সাথে গোসলে নেমে ডুবে যায়। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে এসব দুর্ঘটনা। একের পর এক মৃত্যুর খবরে জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিশুদের মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল ও নিহতদের বাড়ির পরিবেশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের শিশুমৃত্যু কমাতে টিকাদান, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। কিন্তু পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে দীর্ঘদিন কোনো সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি ছিল না। তাদের মতে, প্রধান কারণগুলো হলো শিশুদের পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব। বাড়ির পাশে অরক্ষিত পুকুর ও ডোবা। শিশুদের সাঁতার না জানা। নিরাপদ ডে-কেয়ার বা কমিউনিটি ক্রেশের অভাব। দুর্ঘটনার পর ঈচজ বা জরুরি জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা।

তবে গবেষণায় বলা হয়েছে কমিউনিটি ক্রেশে শিশুদের রাখলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একইভাবে ছয় বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের নিরাপদ সাঁতার শেখানোর ঝরিসঝধভব কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একটি মূল্যায়নে দেখা যায়, এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুদের ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি গ্রামে নিরাপদ শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, বাড়ির পাশের পুকুরে বেড়া, সাঁতার শিক্ষা এবং ঈচজ প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে হাজার হাজার শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

সরকারের উদ্যোগ
এদিকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহতা কমাতে জাতীয় পর্যায়ে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নেয়া এই কৌশলে শিশুদের নিরাপত্তা, সাঁতার শিক্ষা, জলাশয়ের ঝুঁকি কমানো, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রণীত “পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা”-তে বলা হয়েছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই এ ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার। বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বহু শিশুর প্রাণহানি ঘটে।
সরকারের এই কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো পানিতে ডুবে মৃত্যু ও এর কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিশু সুরক্ষা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিচর্যা কেন্দ্র
কর্মপরিকল্পনায় ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ এই বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র বা ক্রেশ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যরা যখন কৃষিকাজ, গৃহস্থালির কাজ বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সরকারের পরিকল্পনায় শিশুদের নিরাপদ সাঁতার শেখানোর বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পানিতে বিপদে পড়লে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদভাবে উদ্ধার করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাড়ির পাশে থাকা পুকুর, ডোবা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জলাশয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো।

উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা
কর্মপরিকল্পনায় পানিতে ডুবে যাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার এবং জীবন রক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধারকারী তৈরি, ঈচজ বা জরুরি জীবন রক্ষাকারী প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র জানতে তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি পরিচালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, অবকাঠামোগত ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

২০৩০ সালের লক্ষ্য
জাতীয় কর্মকৌশলের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু কোনো অনিবার্য দুর্ঘটনা নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এই মৃত্যু অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। সরকারের নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের হাজারো পরিবারকে এই বেদনাদায়ক ক্ষতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝