রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৭ পিএম   (ভিজিট : ৬২)
X

ট্রিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর বাজারে বাংলাদেশের দৃষ্টি। চিপ ডিজাইন থেকে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির স্বপ্ন; দক্ষ জনশক্তি, সরকারি উদ্যোগ ও বৈশ্বিক চাহিদায় খুলছে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত

দেশের সম্ভবনায় প্রযুক্তি বিকাশের খাত হলো সেমিকন্ডাক্টও শিল্প। শব্দটির বেশিরভাগ মানুষের অপরিচিত হলেও পোশাক শিল্পের পরেই এই শিল্পের সম্ভবনাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই শিল্প বিকাশে গুরুত্ব আরোপ করেছেন । তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় খাত।

 ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনাময় পরবর্তী প্রধান এই চালিকাশক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার ইতোমধ্যে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিসহ সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে উল্লেখ করেন। 

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে এখন একটি ক্ষুদ্র বস্তু সেমিকন্ডাক্টর চিপ। আকারে কয়েক মিলিমিটার হলেও এই চিপ ছাড়া আজকের স্মার্টফোন, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বৈদ্যুতিক গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্র, স্যাটেলাইট, ডেটা সেন্টার, এমনকি আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রও কার্যত অচল। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ভাষায়, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতিতে তেলের মতোই কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর।

বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার খোঁজে এগোচ্ছে দেশও। এখনো দেশে কোনো ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন (চিপ উৎপাদন) কারখানা না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, এমবেডেড সিস্টেম, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে অ্যাসেম্বলি ও প্যাকেজিং (ঙঝঅঞ) খাতে অবস্থান তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্পের পর উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি রপ্তানির নতুন খাত হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলাই এখন লক্ষ্য।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডার) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর-সম্পর্কিত রপ্তানি আয় প্রায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ জন্য জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ প্রকৌশলী তৈরির উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক বাজারে নজিরবিহীন চাহিদা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বর্তমানে ৬০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের বাজার। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী এক দশকের মধ্যেই এই বাজারের আকার প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এর প্রধান কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, ৫জি, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং শিল্প অটোমেশনের দ্রুত সম্প্রসারণ।

তারা বলেন, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি শিল্প এখন সেমিকন্ডাক্টরনির্ভর। একটি আধুনিক স্মার্টফোনে ১০০টির বেশি চিপ ব্যবহৃত হয়। একটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে কয়েক হাজার সেমিকন্ডাক্টর উপাদান থাকে। চিকিৎসা যন্ত্র, কৃষি প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড, ব্যাংকিং, মহাকাশ গবেষণা ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও দ্রুত বাড়ছে চিপের ব্যবহার।

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ চিপ উৎপাদনে নয়; বরং চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং ও সফটওয়্যারভিত্তিক সেবা রপ্তানিতে। কারণ উন্নত চিপ উৎপাদন কারখানা স্থাপনে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ডিজাইন ও প্রকৌশলভিত্তিক সেবায় তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সম্ভব।

বর্তমানে দেশের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য মাইক্রোকন্ট্রোলার, সেন্সর, পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট আইসি, যোগাযোগ প্রযুক্তির চিপ, অটোমোটিভ ইলেকট্রনিক্স এবং এমবেডেড সিস্টেমের নকশা ও যাচাইয়ের কাজে যুক্ত রয়েছেন। এসব ডিজাইন পরে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের ফাউন্ড্রিতে উৎপাদিত হয়।

তরুণ প্রকৌশলীরাই বড় শক্তি
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০ হাজারের বেশি কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিক্স প্রকৌশলী স্নাতক হচ্ছেন। ইতোমধ্যে শত শত বাংলাদেশি প্রকৌশলী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে কাজ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানবসম্পদই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিএলএসএল, এএসআইসি, এফপিজিএ, এমবেডেড সিস্টেমস আই-সি ডিজাইন (বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে নির্দিষ্ট কাজের জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা)’র ওপর আরও আধুনিক পাঠক্রম চালু করা গেলে আগামী দশ বছরে বাংলাদেশ হাজার হাজার দক্ষ চিপ ডিজাইন প্রকৌশলী তৈরি করতে পারবে।

সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্স গঠন করেছে। পাশাপাশি হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ, কর-সুবিধা, বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানি আকর্ষণ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রথম ধাপে লক্ষ্য থাকবে, আন্তর্জাতিক মানের চিপ ডিজাইন কোম্পানি গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিকন্ডাক্টর গবেষণাগার স্থাপন। ইলেক্ট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ানো। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অ্যাসেম্বলি ও প্যাকেজিং শিল্প গড়ে তোলা। স্থানীয় প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি।

যে খাতে সবচেয়ে বেশি সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো হলো আই-সি ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, এমবেডেড সিস্টেমস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স চিপ ডিজাইন, অটোমোটিভ ইলেকট্রনিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সেমিকন্ডাক্টর সফটওয়্যার, পিসিবি ডিজাইন, ও-স্যাট (আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট)। বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ব্যয় কমাতে ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা আউটসোর্স করছে। দক্ষ জনবল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশও এই বাজারের একটি অংশ অর্জন করতে পারে।

চ্যালেঞ্জও কম নয়
তারা বলছেন, তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। দেশে এখনো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার অপ্রতুল। ব্যয়বহুল ইডিএ সফটওয়্যারের লাইসেন্স, অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর স্বল্পতা, গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের (আইপি) সুরক্ষার ঘাটতি শিল্পের অগ্রগতিতে বাধা হতে পারে। এছাড়া ভারত, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত নীতিগত সংস্কার, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে।

নতুন রপ্তানি অর্থনীতির সম্ভাবনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি সরকার ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে, তাহলে আগামী এক দশকে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে। এতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ই বাড়বে না, সৃষ্টি হবে উচ্চ বেতনের হাজার হাজার কর্মসংস্থান, বাড়বে গবেষণা ও উদ্ভাবন, শক্তিশালী হবে দেশের প্রযুক্তি শিল্প।

তাদের ভাষায়, যেমন তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করেছে, তেমনি সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প হতে পারে আগামী দুই দশকের নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন। ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশ এখনো ক্ষুদ্র, কিন্তু সুযোগের জানালা এখনই খোলা। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝