যে কোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি
শাহীন রহমান

বঙ্গভবনে জোর প্রস্তুতি, রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা তুঙ্গে; স্পিকার হতে পারেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ। বঙ্গভবন ও রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি যে কোনো সময় পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।
এমনকি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তাঁর পদত্যাগপত্র পৌঁছাতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ ঘিরে সরকারের অবস্থানও সতর্ক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতির অপশন আছে পদত্যাগ করার। সরকারের বলার কিছু নেই। তিনি চাইলে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারেন।”
একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়টিকে এখনো গুঞ্জন হিসেবেই উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি তিনিই বলতে পারবেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে আরেকটি আলোচিত গুঞ্জনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বিদেশে অবস্থানকালে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ করেছেন এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে এমন তথ্য পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও বঙ্গভবনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি স্নায়বিক জটিলতায় ভুগছেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ পেয়েছেন। এ কারণেই তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব তথ্যও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে এরপর কী হবে এ প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দেবেন। পদটি শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এরপর সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আর ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
বর্তমান জাতীয় সংসদের স্পিকার অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এরপর সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি কে হতে পারেন, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। যদিও সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্রহণযোগ্যতা, সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সব নামই কেবল আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে; কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি যদি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তাহলে দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই তাঁর পদত্যাগ নিয়ে সময়ে সময়ে আলোচনা হলেও এবার প্রথমবারের মতো বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র তাঁর পদত্যাগের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত পুরো বিষয়টি এখনো অপেক্ষা ও জল্পনার মধ্যেই রয়েছে। এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন এবং কূটনৈতিক মহল এখন নজর রাখছে বঙ্গভবনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জমা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, আর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে আসছেন সেই প্রশ্নেরও উত্তর মিলবে অল্প সময়ের মধ্যেই। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বঙ্গভবন সব পক্ষই সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।
আ.দৈ/আরএস




















