নৈতিক স্খলন প্রমাণিতভাইরাল ভিডিওতে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত
দল থেকে বহিষ্কার গাজী নজরুলের এমপি পদ কি থাকবে?
শাহীন রহমান

এক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ।
একই সঙ্গে তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে জামায়াত। তবে বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দলীয় সদস্যপদ হারালেও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ কি বহাল থাকবে, নাকি তা শূন্য ঘোষণা হবে?
জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর প্রথমদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি। পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। তিনি লিখেছেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে তাদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় এবং ঘটনাটি একটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে তার এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে করেনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সাংগঠনিক তদন্ত শেষে দলটি তাকে বহিষ্কার করে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এখন মূল প্রশ্ন: এমপি পদ থাকবে কি?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সেই দল থেকে নিজে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। কিন্তু সংবিধানে দল কর্তৃক বহিষ্কারের ফলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে এমন কোনো বিধান নেই। এ কারণেই গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এখন সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনাও একই প্রশ্ন তুলেছিল॥ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনায় একই ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এসেছিল। ২০১৪ সালে হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তাকে প্রথমে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তার দলীয় সদস্যপদ স্থগিত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। সে সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল হলে সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হবে। কিন্তু তখনই বিষয়টি নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়। কারণ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের কোনো বিধান নেই।
সে সময় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সংবিধানে যেসব কারণে এমপি পদ শূন্য হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে; দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি সেখানে নেই। পরবর্তীতে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হয়নি। পরে তিনি নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
অতীতের আরও নজির॥ সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অতীতেও কয়েকজন সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তাদের সংসদ সদস্যপদ বহাল ছিল। অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তৎকালীন স্পিকার মুহম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তার সংসদ সদস্যপদ বহাল রাখেন। একইভাবে নবম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু তার সংসদ সদস্যপদও বহাল ছিল। এসব নজির থেকে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশে দলীয় বহিষ্কার এবং সংসদ সদস্যপদ হারানো একই বিষয় নয়।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী হতে পারে?
জামায়াত ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে শুধু দলীয় চিঠি পাওয়ার ভিত্তিতে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হয়ে যায় না। প্রয়োজন হলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশন, সংসদের স্পিকার এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার আলোকে নিষ্পত্তি হতে পারে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সংসদ সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ না করেন কিংবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত অন্য কোনো কারণ না ঘটে, তাহলে শুধুমাত্র দলীয় বহিষ্কারের কারণে সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করার সাংবিধানিক ভিত্তি দুর্বল।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেনছেন, কোনও ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়া, নৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা বা অভিযোগ ওঠার কারণে সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার বিধান নেই। সংবিধানে এমন কোনও অনুচ্ছেদ নেই যেখানে শুধু অভিযোগ বা নৈতিক সমালোচনার ভিত্তিতে সরাসরি সদস্যপদ বিলুপ্তি হবে।
এ কারণে আইনজীবীরা বলছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজী নজরুল ইসলাম দলীয়ভাবে বহিষ্কৃত হলেও তার সংসদ সদস্যপদ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা কম। অতীতে এই ধরনের ঘটনার নজির থাকলেও সংসদ সদস্য পদ যায়নি। লতিফ সিদ্দিকী, আবু হেনা এবং এইচ এম গোলাম রেজার ঘটনাগুলোও একই বাস্তবতা তুলে ধরে। তবে নির্বাচন কমিশন, সংসদের স্পিকার কিংবা আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
ফলে গাজী নজরুল ইসলামের দলীয় ভবিষ্যৎ আপাতত নির্ধারিত হলেও তার সংসদ সদস্যপদের ভবিষ্যৎ এখনো সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
আ.দৈ/আরএস




















