রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ঢাকা শহর ধীরে ধীরে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৮:১০ পিএম  আপডেট: ১৯.০৭.২০২৬ ৬:৪৯ পিএম  (ভিজিট : ৯৬)
X

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ঢাকা শহর ধীরে ধীরে ঘনবসতিপূর্ণ জনপদে পরিনত হয়েছে। সেই সাথে এই শহরের সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে, নিরাপদ ও শান্তিময় বাসযোগ্যতাও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। এই অপরিচ্ছন্ন শহরের তালিকায় শীর্ষে স্থান পাচ্ছে ঢাকা শহরের নাম। এই পরিস্থিতিতে সরকার, ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং নগরবাসীর কি করণীয় এসব বিষয় নিয়ে একটি গবষেণা মূলক  প্রবন্ধ/প্রতিবেদন তৈরি করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর।

আজ বুধবার (১৫ জুলাই) ডিএনসিসি আয়োজিত প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিলটনের সভাপতিত্বে ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : আমার-আপনার সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেছেন কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর।

নিম্মে প্রবন্ধটি হুবহু  তুলে ধরা হচ্ছে:
"নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আমার আপনার সকলের দায়িত্ব।একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর গড়ে তোলার জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভোগ্যপণ্যের বানহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি হচ্ছে। এই বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহার না করলে পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা, রোগব্যাধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।

ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪০০০ টন কঠিন বর্জ্য আমিন বাজার ল্যান্ডফিলে পরিত্যাজান করা হয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জৈব বর্জ্য হলেও প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য ও নির্মাণ বর্জ্যের পরিমাণও ক্রমাগত বাড়ছে। নগরবাসীর অসচেতনতা, উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব এবং সীমিত পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল। করে তুলছে।

পরিচ্ছন্ন শহর একটি সভ্য জাতির পরিচয়। নগরের সৌন্দর্য, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে বর্জ্যের পরিমান দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-11) অর্জনের জন্য আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং অংশগ্রহণমূলক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

বর্জ্য (Waste) হলো এমন সকল পদার্থ যা ব্যবহার শেষে আর প্রয়োজনীয় থাকে না এবং পরিত্যক্ত হয়। গৃহস্থালি বর্জ্য, খাদ্য বর্জ্য, প্লাস্টিক বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জা, শিল্প বর্জ্য, ই-বর্জ্য, নির্মাণ বর্জ্য কৃষি বর্জাসহ বর্জাকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। আবাসিক এলাকা, বাজার, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, শিল্প প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রকল্প হতে বর্জ্য উৎপন্ন হয়। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে পরিবেশগত ক্ষতি- বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, দুর্গন্ধ হয় এছাড়াও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি- ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া টাইফয়েড সহ শ্বাসকষ্ট হয়। এর কলে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধিসহ পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ডিএনসিসি (DNCC) বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। বর্জ্য পরিবহনের জন্য কম্প্যাক্টর ট্রাকের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। ডিএনসিসির আওতাভুক্ত এলাকায় প্রায় ৫৪ টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন কার্যকর রয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য সুইপিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। খুলো নিয়ন্ত্রণে Spray Cannon এর ব্যবহার নাগরিক জীবনে স্বস্তি এনেছে। ডিএনসিসির আওতায় প্রায় ২৯টি খাল রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৭.৮৮ কিলোমিটার। ডিএনসিসির আওতায় ১২৩০ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। 

নিয়মিতভাবে খাল ও ড্রেন হতে কঠিন বর্গা ও স্লাজ অপসারণ করা হচ্ছে। ঈদুল আজহার বর্জ্য অপসারণে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম গ্রহন করা হয়। ঈদের সময় অতিরিক্ত জনবল, অতিরিক্ত যানবাহন ব্যবহার করে দ্রুত কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা হয়। আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে Waste to Energy Project বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে দৈনিক প্রায় ৩,০০০ টন বর্জ্য ব্যবহার ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। DNCC বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়কাজ করছে। JICA এর কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় Project for Waste Reduction and Support for Building a Sustainable Society বাস্তবায়িত হচ্ছে।

 বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের অনেক কর্তব্য আছে :
 যেখানে সেখানে বর্জ্য না ফেলা; ডাস্টবিন ব্যবহার করা; প্লাস্টিকের কম ব্যবহার; বর্জ্য আলাদা করা; পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহার; পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণ; শিশুদের সচেতন করা; সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনা অনুসরণ করা ।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ডিএনসিসি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম কার্যক্রমঃ

অঞ্চলভিত্তিক "Clean Week"- "পরিচ্ছন্ন সপ্তাহ" চালুকরন; পর্যায়ক্রমে অঞ্চল ভিত্তিক সপ্তাহব্যাপী "Clean Week"- "পরিচ্ছন্ন সপ্তাহ" চালু; মসজিদের ইমামদের সম্পৃক্তকরণ; স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ; মাইকিং-করণ;
বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণের বিষয়ে বাসিন্দাদের সচেতন করা; বর্জ্য পৃথকীকরণে উৎসাহিত করা; প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস করা ও পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) উৎসাহিত করা; ওপেন ডাম্পিং বন্ধকরনে হাউজিং সোসাইটি। বাড়িমালিক/দোকানমালিক সমিতির সহযোগিতা; বর্জ্য ফেলার জায়গা চিহ্নিত করে সচেতনতা সাইনবোর্ড টানানো, জরিমানা ও প্রচার শুরু করা।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম কার্যক্রমঃ
প্রকৌশল বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ডেভেলপারদেরকে Salvage Material চেনের উপর থেকে অপসারণের ব্যবস্থা করণ; ওয়ার্ড ভিত্তিক Waste Management Support Team গঠন; জনসচেতনতা সৃষ্টি, কমিউনিটি ইনগেজমেন্ট, ড্রেন, পার্ক, লেক পরিষ্কার, ভ্যান সার্ভিস, রাস্তা পরিষ্কারে যুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহমূলক সম্মাননা প্রদান ।

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে মেডিক্যাল বর্জ্য, ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য, ডেরিজ ম্যানেজমেন্ট এবং প্লাস্টিক রিসাইকেলিং-সহ যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহন করে একটি "সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি" গড়ে তোলা; স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসুচি।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম কার্যক্রমঃ
প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে একটি করে এসটিএস (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) স্থাপন; প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতাকর্মী তদারকি কেন্দ্র নির্মাণ; ২টি Waste Recycling Plant স্থাপন: পাইলট মেটেরিয়াল রিকভারি সেন্টার (MRF) স্থাপন;

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে পরিবেশসম্মত ইনসিনেরেশন প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন; শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশনের একক প্রচেষ্টায় ঢাকার মতো একটি মেগা শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর গড়ে তুলতে সরকার, সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। "নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আমার আপনার সকলের দায়িত্ব" এই প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব।

সুপারিশসমূহঃ
উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করা; পুনর্ব্যবহার শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা; প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাসে কার্যকর নীতি গ্রহণ; স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা; নাগরিকদের জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালানো; খাল ও চেনে বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা; "3R(Reduce, Reuse, Recycle)" নীতি সর্বস্তরে বাস্তবায়ন করা।
উল্লেখ্য: লেখক নৌবাহিনীর কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝