রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে ঢাকার জলাবদ্ধতা
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:২৮ পিএম   (ভিজিট : ৭৮)
X

গবেষণা বলছে, ভারী বৃষ্টি নয় খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অকার্যকর ড্রেনেজই রাজধানীকে ডুবিয়ে দিচ্ছে

দেশের অন্যান্য এলাকার মতো দু’দিনের ভারী বর্ষণে বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহর পানিতে তলিয়ে যায়। আবহাওয়া অফিস জানায় রোববার ২৪ ঘন্টায় ঢাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৯৫ মিলিমিটার। ২০০৯ সালের পর এবার এমন ভারী বৃষ্টিপাতে ব্যাপক দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। 

শহরের প্রতিটি অলি, গলি, প্রধান সড়ক পানির নিয়ে তলিয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঢাকার এই দুর্ভোগ শুধু ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট নয়। এর পেছনে প্রধান দায়ি অপরিকল্পিত নগরায়ণ।  গবেষণা বলছে, খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অকার্যকর ড্রেনেজই রাজধানীকে বারবার ডুবিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএফএম)-এর গবেষকদের ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন দশকে দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক খালগুলোর বড় অংশ সংকুচিত হয়েছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে।

 গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, গোরানচটবাড়ী প্রাকৃতিক জলাধার গবেষণা এলাকায় ২০২২ সালে নির্মিত স্থাপনার আওতায় থাকা ভূমির পরিমাণ ছিল ৭৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বর্তমান নগরায়ণের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪২ সালে তা বেড়ে ৮৯ দশমিক ৪৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে ৫০ বছর পর এসব এলাকায় সমপরিমান বৃষ্টিতে প্লাবিত এলাকার পরিমাণ আরও ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার এলাকা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ওয়াটার-এ প্রকাশিত গবেষণায় উত্তর ঢাকার গোরানচটবাড়ী ক্যাচমেন্ট এলাকার ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, খাল-জলাধারের অবস্থা এবং বৃষ্টির পানির প্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা স্যাটেলাইট চিত্র এবং স্টর্ম ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট মডেল ব্যবহার করে ১৯৭৩ থেকে ২০২২ সালের পরিবর্তন মূল্যায়ন করেন এবং ২০৪২ সালের সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেন। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, গোরানচটবাড়ী প্রাকৃতিক জলাধারের (রিটেনশন পন্ড) ধারণক্ষমতাও দখল ও ভরাটের কারণে কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরও বাড়াবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ঢাকায় নির্মিত এলাকার সম্প্রসারণের গতি ছিল প্রতি বছর ২ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি, যা আগের দুই দশকের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি। এই দ্রুত নগরায়ণের ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ কমে গেছে; অধিকাংশ পানি সরাসরি ড্রেনে গিয়ে অল্প সময়েই সেগুলো ভরাট হয়ে উপচে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যান্ডস্কেপ এন্ড আরবান প্লানিং এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বৃহত্তর ঢাকার ফ্লাড ফ্লো জোন ও প্রাকৃতিক জলাধার ( রিটেনশন পন্ডে) সরকারি ও বেসরকারি আবাসন উন্নয়নের ফলে ব্যাপক ভূমি ভরাট হয়েছে। গবেষকদের মতে, বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও জলাধার সংকুচিত হওয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে এবং নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরের প্রায় ৩৫ শতাংশ এলাকা উচ্চ অথবা অত্যন্ত উচ্চ জলাবদ্ধতা-ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ভবন নির্মিত এলাকার বিস্তার, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক থেকে দূরত্ব এবং জলাভূমি হারিয়ে যাওয়ার কারণে এসব এলাকায় পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিবেশবিদ প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ। প্রাকৃতিক খাল ও ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন, নির্মাণবর্জ্য এবং কঠিন বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক খাল বর্জ্য বহনের নালায় পরিণত হওয়ায় তাদের মূল নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়ে গেছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৫০০ বাসিন্দার ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ উত্তরদাতা প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এক থেকে তিন দিন জলাবদ্ধতার শিকার হন। অংশগ্রহণকারীরা অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের অতিবৃষ্টিকে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গবেষকরা আরও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু ঢাকার বিদ্যমান ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ এমন বৃষ্টির চাপ সামাল দেয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়নি। ফলে কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণেই নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে।

পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে এ সংকটের সমাধান হবে না। খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, দখলমুক্ত করা, প্রাকৃতিক জলাধার (রিটেনশন পন্ড) সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, পারমিয়েবল পেভমেন্ট বা পানি শোষণক্ষম অবকাঠামো নির্মাণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।

গবেষণাগুলোর সার্বিক বিশ্লেষণ বলছে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, জলাধার হারিয়ে ফেলা এবং দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফল। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে ভবিষ্যতে একই মাত্রার বৃষ্টিতেও আরও বিস্তৃত এলাকা, আরও দীর্ঘ সময় এবং আরও বেশি মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হবে—এমন আশঙ্কাই তুলে ধরছেন গবেষকরা।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝