বিশ্বের সর্বোচ্চ বন্যাঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে
শাহীন রহমান

এ বছর এপ্রিলে হাওরে আগাম বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা সর্বশান্ত হয়েছে কৃষক। এর রেশ কাটতে না কাটতে দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে লাখ লাখ পানিবন্দি। পাহাড় ধ্বসে মৃত্যু হয়েছে প্রায় অর্ধশত মানুষের। শুধু এবারই নয়। প্রতি বছর দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মৃত্যুসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শিকার হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে নদী বন্য ও ঘুর্ণিঝড়ের ঝুকির তালিকায় বাংলাদেশের নামে শীর্ষ তালিকায়। এছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংল াদেশ একটি আলোচিত নাম। এ কারণেই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, বজ্রপাত, পাহাড়ধস কিংবা তাপপ্রবাহ প্রায় প্রতি মৌসুমেই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। গত কয়েক দশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের ঝুঁকি কমেনি; বরং নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেস্ক ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০-১১টি সর্বোচ্চ দুর্যোগঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে অবস্থান করছে। দেশটিকে অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশন ও জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ইনফর্ম রিস্ক ইনডেস্ক বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নদীবন্যা। নদীবন্যা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ ঝুঁকির দেশগুলোর একটি এবং ঘূর্ণিঝড় ঝুঁকিতেও বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
আবওয়া অধিদপ্তরের সাবেক উপ পরিচালক ড, আব্দুল মান্ন্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্রম্পতি সময়ে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। এছাড়া ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ঘুর্ণিঝড় বন্যা নদী ভাঙ্গনের মতো দুর্যোগ বাড়ছে। যদিও তিনি বলেন এসব দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশের সক্ষমতা বাড়ছে অনেক। বিশেষ করে ৭০ সালের ঘুর্ণিঝড়ের দেশে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও ২০২২ সালের অতিপ্রবল ঘুর্ণিঝড়ের মাত্র ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৮৫টি চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা (ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ ইত্যাদি) ঘটেছে গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ অতিরিক্ত উষ্ণতা বাড়বে এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নদীর সর্বোচ্চ প্রবাহ ১৯৭১-২০০০ সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬% পর্যন্ত বাড়তে পারে, ফলে বন্যার ঝুঁকিও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দুর্যোগের মূল কারণ কেবল জলবায়ু পরিবর্তন নয়; বরং দেশের ভৌগোলিক অবস্থান। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপে অবস্থিত বাংলাদেশে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার বিশাল জলরাশি এসে মিলিত হয়। প্রতিবছর বর্ষায় হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি এবং দেশে ভারী বৃষ্টিপাত মিলিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা প্রতি বছর বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। চরম পরিস্থিতিতে এই সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আইএমএফের সাম্প্রতিক কারিগরি প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলও দুর্যোগের অন্যতম কেন্দ্র। বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় এবং অন্তত একটি বাংলাদেশ বা পার্শ্ববর্তী উপকূলে আঘাত হানে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উষ্ণ সমুদ্রের পানি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সতর্ক করেছে।
শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় একই এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠী বসবাস করে। নদীতীর, চরাঞ্চল, উপকূল এবং পাহাড়ের ঢালে বসতি বিস্তার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং দারিদ্র্য দুর্যোগকে মানবিক বিপর্যয়ে রূপ দেয়। ইনফর্ম বাংলাদেশ মডেলে দেশের ৬৪ জেলা ও ৫৫৩ উপজেলার ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই দুর্যোগের প্রভাব সব এলাকায় সমান নয়; স্থানীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি ইউনিয়নের দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিবেশগত অবক্ষয়, জীবিকার অনিশ্চয়তা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সম্মিলিত প্রভাবে কিছু এলাকায় ঝুঁকি অন্যগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকি নিরূপণের নতুন পদ্ধতির সুপারিশ করেছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। আইএমএফও সতর্ক করেছে, দুর্যোগ মোকাবিলা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে এখনই বড় বিনিয়োগ না হলে উন্নয়নের অর্জন ঝুঁকিতে পড়বে। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, আগাম সতর্কবার্তা, নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
তবে আশার দিকও রয়েছে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হলেও বর্তমানে আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি সফল উদাহরণ হিসেবেও তুলে ধরে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, প্রাণহানি কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি, জলবায়ু উদ্বাস্তু, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং জীবিকা সংকট দ্রুত বাড়ছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুর্যোগের পর উদ্ধার নয়, বরং দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কারণ গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও উপকূলীয় ঝুঁকি আরও বাড়বে। সেই বাস্তবতায় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও নতুন করে সাজানো ছাড়া বিকল্প নেই।
আ.দৈ/আরএস




















