সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুধু বৃষ্টি নয়, মানুষই তৈরি করছে পাহাড়ধসের মৃত্যুফাঁদ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ৬৭)
X

পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে বাড়ছে প্রাণঘাতী ধস; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেও বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি

কয়েকদিন ধরেই টানা বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বিভাগে গত পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসের দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। সেখানে দেখা যায়, দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারে, সেখানে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

এছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় ৫ জন করে এবং রাঙ্গামাটি জেলায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বৃষ্টি হলেই কেন দেশে পাহাড় ধ্বস ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে।  পাহাড় ধ্বসে এখন পর্যন্ত কতজন মারা গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০০০ সালের পর বাংলাদেশে পাহাড়ধসে কয়েক শ’ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০০৭, ২০১২ ও ২০১৭ সালের বড় ঘটনাগুলোতেই চার শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। এর মধ্যে ২০১৭ সাল প্রায় ১৭৬ জন, ২০০৭ সাল প্রায় ১২৭ জন এবং ২০১২ সাল প্রায় ১১৩ জনের মৃত্যু হয়। 

২০০৭ সালের পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের মুত্যুর ঘটনার পর তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাহাড় ধসের কারণ ও প্রতিকার জানতে ১১ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি প্রতিবেদন দিলেও কমিটির সুপারিশ কাজে লাগানো হয়নি। 

কমিটির অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম উল্লেখ করেন পাহাড় ধসের কারণ প্রাকৃতিকের চেয়ে মানুষেরই সৃষ্টি বেশি। পাহাড় কেটে ফেলা, গাছপালা কেটে ফেলা, পাহাড় লিজ দেয়া, পাহাড়ে সেটেলারদের বসতি, পাহাড়কে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবাহার করা অন্যতম কারণ।

প্রকৃতির নিয়মে আবারো এসেছে বর্ষা। প্রতি বর্ষার মতো এবার একই দৃশ্য। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি, তারপর পাহাড়ধস। চাপা পড়ে ঘরবাড়ি, হারিয়ে যায় মানুষের জীবন। প্রশ্ন ওঠে—বৃষ্টি কি একাই এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী? দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষণা বলছে, উত্তরটি ‘না’। 

বৃষ্টি কেবল শেষ ধাক্কা দেয়; প্রকৃত বিপর্যয়ের বীজ বপন করে মানুষ নিজেই। বছরের পর বছর পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়ে যাওয়া অতি ভারী বৃষ্টিপাত সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়গুলোকে ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা হয়েছে।

গবেষকরা জানিয়েছেন, পাহাড়ধস একটি “বহুকারণনির্ভর দুর্যোগ”। অর্থাৎ, শুধু বৃষ্টি হলেই ধস নামবে না; কিন্তু যখন পাহাড়ের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করা হয়, গাছপালা কেটে ফেলা হয় এবং দুর্বল ঢালে বসতি গড়ে ওঠে, তখন প্রবল বর্ষণ সেই দুর্বল পাহাড়কে মুহূর্তেই ভেঙে ফেলে। চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্বত্য অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ বড় পাহাড়ধস ঘটেছে এমন এলাকায় যেখানে আগে পাহাড় কাটা, রাস্তা নির্মাণ বা অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কার্যক্রম হয়েছে।

গবেষণাগুলো বলছে, পাহাড়ের মাটি যখন টানা বৃষ্টিতে পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, তখন মাটির ভেতরের ঘর্ষণশক্তি কমে যায়। ফলে ঢালের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ধস নামে। কিন্তু স্বাভাবিক বনভূমিতে গাছের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। বিপরীতে বন উজাড় হলে পানি দ্রুত মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ফলে একই পরিমাণ বৃষ্টিতে একটি অক্ষত পাহাড় টিকে গেলেও কাটা বা বনহীন পাহাড় ধসে পড়তে পারে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলোর ভূতাত্ত্বিক গঠন তুলনামূলকভাবে নরম। বেলেপাথর, সিল্ট ও কাদামাটির স্তর সহজেই পানি শোষণ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় এসব পাহাড়ে ধসের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

দেশে পাহাড় ধ্বসের কারণে নিয়ে দেশি বিদেশি বহু গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় বহ আগ থেকে পাহাড় ধ্বসের ঝুকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। বিশেষ করে  বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এ বিষয়ে একাধিক গবেষণা করেছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গবেষণা পরিচালনা করে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর থেকে ১৯৮১ সালে। 

স্লোপ ইনস্ট্যাবিলিটি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ড্যামেজ অ্যাট মারক্যান্টাইল মেরিন একাডেমি, চিটাগং ডিস্ট্রিক্ট, বাংলাদেশ শীর্ষক কে.এম. শহিদুল হাসান রচিত এই গবেষণাপত্রে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা এবং তার ফলে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণাটি চট্টগ্রামের তৎকালীন মারকেন্টাইল মেরিন একাডেমি এলাকার পাহাড়ি ঢাল ও সেখানে নির্মিত স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির কারণ অনুসন্ধান করে। এতে দেখা যায়, একাডেমির বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোতে দেখা দেওয়া ফাটল এবং ভূমির সরে যাওয়ার ঘটনা কেবল নির্মাণগত ত্রুটির কারণে নয়; বরং পাহাড়ি ঢালের ধীরগতির অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গবেষক দেখান যে, ”দুপি টিলা ফরমেশন” (বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক স্তর) এর ওপর গড়ে ওঠা ঢালগুলোতে মাটির পার্শ্বীয় সরে যাওয়া (ল্যাটেরাল স্প্রেডিং) এবং ঢালের ধীরে ধীরে বিকৃতি ভবনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে কাঠামোগত ক্ষতি দেখা দেয়।

গবেষণায় আরও ব্যাখ্যা করা হয়, পাহাড়ের ভেতরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করলে মাটির শক্তি কমে যায় এবং ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। বিশেষ করে যেখানে ঢাল খাড়া, মাটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে, সেখানে ভূমিধস ও ঢালধসের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গবেষণাটি বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রকৌশল নকশা, ভূমি ব্যবহার এবং নির্মাণ পরিকল্পনায় ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা বিবেচনার ওপর জোর দেয়।

পরবর্তী কয়েক দশকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধস নিয়ে প্রকাশিত বহু গবেষণায় এই কাজটিকে ভিত্তিমূলক রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী গবেষণাগুলোও নিশ্চিত করেছে যে, দুর্বল ভূতাত্ত্বিক গঠন, অতিবৃষ্টি, পাহাড় কাটা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ একসঙ্গে কাজ করলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, ১৯৮১ সালে জিএসবি যে ভূতাত্ত্বিক সতর্কবার্তা দিয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের পাহাড়ধস গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটার প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। পাহাড়ের পাদদেশ বা ঢাল কেটে ফেললে তার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। পরে ভারী বৃষ্টির সময় ওই অংশ ধসে পড়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। আধুনিক ভূ-তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে করা গবেষণায় পাহাড় কাটা, রাস্তা কাটা, ঢালের কোণ, ভূমির ব্যবহার, বৃষ্টিপাত এবং ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একত্রে বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকির এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষকরা দাবি করছেন, এসব মানচিত্র ব্যবহার করলে আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কক্সবাজার অঞ্চলের গবেষণায় এমন বৃষ্টির মাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে, যার পর ঢাল ধসে পড়ার সম্ভাবনা দ্রুত বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, এই তথ্য ব্যবহার করে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির নিয়েও পরিচালিত গবেষণা একই বার্তা দিয়েছে। সেখানে পাহাড় কাটা, ব্যাপক বৃক্ষনিধন, ঘনবসতি, দুর্বল মাটির গঠন এবং অতিবর্ষণের সমন্বয়ে প্রতি বর্ষায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। গবেষণায় আধুনিক ভূ-তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি মানুষের ঝুঁকি কমানোর কৌশলও তুলে ধরা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করেও বাংলাদেশের পাহাড়ধস নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, কোথায় বনভূমি কমেছে, কোথায় রাস্তা পাহাড় কেটে নির্মাণ হয়েছে, কোথায় ঢাল বেশি খাড়া এবং কোথায় বৃষ্টির প্রভাব বেশি এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা যায়। গবেষকদের মতে, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় এসব তথ্য ব্যবহার করলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

গবেষণাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশে পাহাড়ধসকে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি ক্রমশ মানবসৃষ্ট দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগে থেকেই অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, বন উজাড় কিংবা অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার প্রমাণ মিলেছে। ফলে গবেষকদের সুপারিশ শুধু উদ্ধার তৎপরতা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে নির্মাণ বন্ধ, পাহাড় কাটা রোধ, পুনর্বনায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষণায় বলা হয় পাহাড়ধসের জন্য বৃষ্টিকে একা দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত সমাধান লুকিয়ে আছে মানুষের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মধ্যে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই শোকের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আর পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী হাজারো মানুষের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যেই থেকে যাবে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝