ছয় মাসে নিহত ১০; ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে নজরদারি বাড়লেও প্রশ্নের মুখে সীমান্ত নিরাপত্তা
সীমান্তে কড়াকড়ি, তবু থামছে না প্রাণহানি
নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারত থেকে কথিত ‘পুশ ইন’ প্রতিরোধে গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নজরদারি জোরদার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করার কথা জানিয়ে আসছে সরকার। সীমান্তে টহল বাড়ানো হয়েছে, বিজিবিকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হয়নি।
বরং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও একের পর এক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ গেছে অন্তত ১০ জনের। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ সংশ্লিষ্ট অন্তত ২১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। নিহতদের মধ্যে সাতজন গুলিতে এবং তিনজন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান।
অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছে, তাদের হিসাবে একই সময়ে বিএসএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। বিজিবির তথ্যে নিহতদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘পুশ ইন’ চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে সীমান্তজুড়ে বাড়ানো হয় নজরদারি ও টহল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদও বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা জানান। তবে নিরাপত্তা জোরদারের সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, সীমান্তে সহিংসতা রোধে বাস্তব চিত্রে তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। অতীতের মতোই সীমান্তে গুলি, নির্যাতন এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
আসকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ছয় মাসে গুলিতে নিহত সাতজনের মধ্যে সিলেট বিভাগে তিনজন, রংপুরে দুইজন এবং চট্টগ্রামে দুইজন ছিলেন। অন্যদিকে নির্যাতনে নিহত তিনজনের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে দু’জন এবং রংপুর বিভাগে একজন ছিলেন। এসব তথ্য দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে সংকলন করেছে সংস্থাটি। একই সময়ে সীমান্ত সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। আহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচজন, খুলনা ও রংপুরে দু’জন করে এবং রাজশাহীতে একজন রয়েছেন।
আসকের হিসাবে হতাহতের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, মৌলভীবাজার, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায়। একই সময়ে রংপুর বিভাগে একজনকে অপহরণ বা আটকের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। তবে বিএসএফের ধাওয়া খেয়ে মৃত্যুর কোনো ঘটনা এ সময় রেকর্ড হয়নি। অপহরণ বা আটকের পর কাউকে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করেনি আসক। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে নিহত দুইজনের একজন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া মে মাসে তিনজন এবং জুনে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর প্রাণহানির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সীমান্তে নিহত হয়েছিলেন ১৫ জন এবং আহত হন ২৯ জন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন গুলিতে এবং পাঁচজন নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪ এবং আহত ছিলেন ১১ জন।
২০২৩ সালে নিহত হন ১১ জন, আহত ১৪ জন। ২০২২ সালে নিহত পাঁচ ও আহত চারজন, আর ২০২১ সালের একই সময়ে নিহত ছয় ও আহত চারজন ছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল ২০২০ সালে। ওই বছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে নিহত হন ২৬ জন বাংলাদেশি এবং আহত হন আরও ১৫ জন। ২০১৯ সালের একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০।
কড়াকড়ি সত্ত্বেও কেন সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ঘটনার পটভূমি এক নয়। কোথাও গবাদিপশু আনতে গিয়ে, কোথাও চোরাচালানের অভিযোগে, আবার কোথাও ঘাস কাটতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশিরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, সীমান্তে সব মৃত্যুকেই শুধু ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আত্মীয়তা ও সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বা গবাদিপশু আনতে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেন। তার ভাষায়, অনেক ক্ষেত্রে এসব কারণেই মানুষ বিএসএফের গুলির শিকার হয়েছেন।
তিনি মনে করেন, সীমান্তে বাড়তি সতর্কতার কারণে গত বছরের তুলনায় প্রাণহানি কিছুটা কমেছে। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অতীতে গবাদিপশু ও ফেনসিডিল চোরাচালান সীমান্ত সংঘাতের বড় কারণ হলেও বর্তমানে সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, ‘পুশ ইন’ ইস্যুতে সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়লেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে সমানভাবে নজরদারি সম্ভব নয়। ফলে টহলের ফাঁক গলেই মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে।
তার ভাষায়, সীমান্তের দুই পাশের মানুষের জীবন-জীবিকা, আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। কোথাও একই পরিবারের সদস্য দুই দেশে বাস করেন, কোথাও একটি জমির অংশ বাংলাদেশে, আরেক অংশ ভারতে। চিকিৎসা, বাজার কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সীমান্তের কাছাকাছি গেলেই বাংলাদেশিদের চোরাকারবারি হিসেবে সন্দেহ করে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
নূর খান লিটনের মতে, চোরাচালানের অভিযোগ থাকলে গুলি না করে আইনগত প্রক্রিয়ায় আটক ও বিচার করা উচিত। তিনি এবং এমদাদুল ইসলাম—দু’জনই মনে করেন, চলতি বছরে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও এটিকে পরিস্থিতির মৌলিক উন্নতি বলা যাবে না। কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমনই থাকুক, সীমান্ত হত্যা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। তাদের মতে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রকৃত অর্থে ইতিবাচক বলা কঠিন।
আ.দৈ/আরএস




















