রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উখিয়ায় একদিনেই প্রাণ গেল ৯ জনের
বর্ষায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ধ্বসে বাড়াচ্ছে মানবিক সংকট
বাড়ছে আশঙ্কা:, ঝুঁকিতে হাজার হাজারো পরিবার
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৮:০৩ পিএম   (ভিজিট : ৭২)
X

টানা ভারী বর্ষণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা। একদিনেই পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ জন। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। নারী ও শিশুসহ নিহতদের অধিকাংশই ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়েন। এদিতে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারী হাজারো পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পাহাড় ধ্বসের প্রতি বছর মৃত্যুও ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করে। দুর্ঘটনার পরই কেবল তৎপরতা বাড়ে।

এদিকে আবহাওয়া অফিস দেশের চার বিভাগে আরও দুদিন ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সতর্কতা দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, দীর্ঘদিনের পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ এবং পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে প্রতি বর্ষায় এই ঝুঁকি বাড়ছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিপুলসংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র খাড়া ঢালে নির্মিত হওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে মাটি আলগা হয়ে সহজেই ধস নামছে। একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে স্থানীয় অনেক পাহাড়ি বসতিতেও।

কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণে আবারও প্রাণঘাতী পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও এ ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কার বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন গবেষকেরা। ২০২২ সালে অ্যাসেসিং রেইনফল-ইনডিউসড ল্যান্ডস্লাইড রিস্ক ইন আ হিউম্যানিটারিয়ান কনটেক্সট: দ্য কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইন কক্স’স বাজার, বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছিল, কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা, বিশেষ করে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প, বৃষ্টিজনিত পাহাড়ধসের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণায় জিআইএস স্যাটেলাইট চিত্র, ভূমির বৈশিষ্ট্য, বৃষ্টিপাতের তথ্য এবং পূর্ববর্তী পাহাড়ধসের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে একটি ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা হয়। এতে দেখা যায়, খাড়া পাহাড়ের ঢাল, অস্থিতিশীল মাটি, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ এবং বন উজাড়ের কারণে কয়েকটি ক্যাম্পে বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্প-১০-কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

গবেষকদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে ঘনবসতি, দুর্বল নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি আশ্রয় এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। বর্ষাকালে স্বল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিও বড় ধরনের ধসের কারণ হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

গবেষণায় সুপারিশ করা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে হালনাগাদ ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা। গবেষকদের মতে, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা না হলে প্রতি বর্ষায় কক্সবাজারে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। 

এদিকে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস দীর্ঘদিনের একটি বড় মানবিক সংকট। গত কয়েক বছরে পাহাড়ধসে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা শুরুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া, পাহাড়ের ঢাল সংরক্ষণ এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করা হলেও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। ফলে আগে যেসব এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ ছিল, সেগুলোও এখন ঝুঁকির মধ্যে চলে আসছে। কেবল উদ্ধার অভিযান নয়, বরং আগাম ঝুঁকি নিরূপণ, কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পাহাড়ের অবৈধ দখল ও কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ছাড়া প্রাণহানি কমানো কঠিন হবে।

সোমবার ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের একটি এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন, যাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হচ্ছে। কক্সবাজারে ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী অন্তত দুই দিন একই ধরনের ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ধস, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এ। গভীর রাতে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে একটি আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর পড়ে। এতে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। এর কিছুক্ষণ পর কুতুপালং ক্যাম্পে আরেকটি পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে বালুখালী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে কক্সবাজার শহরের সাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়লে গুরুতর আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।

জেলা প্রশাসন ও উখিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে কিংবা বিকল্প আবাসনের অভাবে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাস করছেন। ফলে সতর্কতা জারি হলেও সবাই নিরাপদ স্থানে যেতে পারছেন না।

এদিকে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসে আগামী কয়েক দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত থাকায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের অপ্রয়োজনে পাহাড়ের ঢালে অবস্থান না করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পাহাড়সংলগ্ন বসতিতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

প্রতি বর্ষার মতো এবারও একদিনের প্রাণহানি নতুন করে মনে করিয়ে দিল, পাহাড়ধস কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি এখন একটি পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ। আগাম সতর্কতা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের নিরাপদ পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া আগামী দিনগুলোতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝